বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১০

সেই ঘন্টাটির ধ্বনি

উলঙ্গ শরীর ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠে। সেই সাথে বাড়ে দুরন্তপনা। পরিবার ও প্রতিবেশীদের হাতের কোমল ছোঁয়ায় কখনো পায় কান্না; আর কখনো পায় তীব্র আনন্দ। এভাবেই বেড়ে যায় বয়স। পিতা-মাতার চিন্তায় হঠাৎই স্থান পায় সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার কথা। সুন্দর ভবিষ্যতের কথা। আর তাই চঞ্চল সন্তানকে পাঠাতে হয় বিদ্যালয়ে। সন্তানের শত অনিহা থাকা সত্তেও বাধ্য হয়েই যেতে হয় বিদ্যালয়ে ভয়ার্থ মনে। কিছুদিন পর অনেক সহপাঠীর সাথেই সখ্যতা গড়ে উঠে। আবার ঝগড়া করে কান্নাভেজা চোখেও বাড়ি ফিরতে হয়। তবুও আবার পা বাড়াতে হয় সেই পথেই....।


এভাবেই দিন কেটে যায়। কেটে যায় মাস। আসে পরীক্ষা। পরিবর্তন হয় শ্রেণীর। আর জীবনের খাতা হতে কমে যায় হাসি-কান্নায় মিশ্রিত একটি বছর। আর সবার দৃষ্টিতে বয়স বাড়তে থাকে। সেইসাথে মাথায় আসতে থাকে দুষ্টু বুদ্ধি। সমবয়সীদের সাথে ঝগড়া, স্কুলে নালিশ, শিক্ষকের হাতের বেত্রাঘাত; সেইসাথে বাড়িতে বিচার। অতঃপর আবারো প্রহার। রাত পোহালেই যেতে হয় বিদ্যালয়ে। পড়া না পারলে আবারো শিক্ষকের বেত্রাঘাত। ফলে মস্তিস্কে এসে যায় ক্লাস ফাঁকি দেয়ার চিন্তা। ক্লাসের সময়টা খেলাধুলা করে কাটিয়ে দিয়ে তারপর বাড়ি ফেরা। মা জিজ্ঞেস করলে- “সব ক্লাস করে এসেছি।” পরের দিন স্কুল বন্ধ বলে না যাওয়া। এর পরের দিন স্কুলে গেলেই স্কুল ফাঁকি দেয়ার দায়ে আবারো শিক্ষকের হাতের প্রহার। এই খেলাতেই শেষ হয়ে যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ। ভর্তি হতে হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। শরীর ও মনে আসতে থাকে অনেক পরিবর্তন। সেইসাথে পড়ালেখার ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। আর সখ্যতা গড়ে উঠে অনেক নতুন নতুন বন্ধুবান্ধবের সাথে।


আমার বহু কষ্ট করেই যেতে হতো বিদ্যালয়ে। ফিরে আসতেও একই কষ্ট পোহাতে হতো। বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যেতো। কর্দমাক্ত পথে যে কতো কষ্ট করে পা ফেলতে হতো তার ইয়ত্তা নেই। হাতে থাকতো বইয়ের ব্যাগ; আর একটু এদিক-ওদিক হলেই কাদায় লুটোপুটি খেয়ে বাড়ি ফিরতে হতো। দুর্ভোগ সবচেয়ে চরমে উঠতো যখন বর্ষাকাল আসতো। স্কুলে যাবার কোন ব্যবস্থা থাকতো না। একদিকে অঝরে মেঘের কান্না, অন্যদিকে পারাপারের প্রতীক্ষায় এই বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা। হঠাৎ কোন মাঝিকে চোখে পড়লেই কণ্ঠনালী হতে প্রবল আনন্দে ধ্বনিত হতো- ও... ভাই..., নৌকা ভিড়াও। আর এর প্রত্যুত্তরে বাঝি বলতো- “না ইশকুলের এইদিকে যাইতাম না।” ফলে বাধ্য হয়েই ন্যাংটা হয়ে গামছা পড়ে বইগুলো হাতে নিয়ে অতি সতর্কতার সাথে সাঁতরিয়ে ডাঙায় উঠে ভেঁজা শরীরেই কাপড় পড়তাম। পরেই এক দৌড়।


ততক্ষণে কয়েকটা ক্লাস চলে গেছে। নতুন ক্লাস স্যার নেয়া শুরু করেছে। স্যার, আসি; বলতেই স্যার ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো- “এতো দেরি করে আসলে কেন? আর তোমার কয়েকটা ক্লাসও তো শেষ হয়ে গেছে।” কিছুণ চুপ করে দাঁড়িয়ে তারপর উত্তর- “স্যার, নৌকা পাইনি, তাই দেরি হয়ে গেছে।” স্যার বলতো- “ শুধু তোমারই তো প্রতিদিন দেরি হয়, আর কারো হয় না কেন? যাক, আস; আর যাতে কোনদিন দেরি না হয়।” এই সংলাপের দশ মিনিট পরেই ক্লাস শেষ। এর পরেই টিফিন। টিফিনের পরে আর দু’টো ক্লাস। ক্লাসগুলো শেষ। একটু পরেই বাঁজে ছুটির ঘন্টা। বাড়ি ফেরার পথেও আসার মতোই বিড়ম্বনা। আবারও ন্যাংটা হয়ে গামছা পড়ে বই হাতে নিয়ে সাঁতরিয়ে বাড়ি ফেরা।


পরের দিনও ঠিক একই কাণ্ড। শাস্তিস্বরূপ স্যার বাইরে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। ক্লাস শেষ হলে টিফিনের পর বাকি ক্লাসগুলো করে ছুটির ঘন্টা বাঁজার সাথেসাথেই পড়তে হয় আবারো বাড়ি ফেরার কষ্টে। এভাবেই সুবিধা-অসুবিধায় কেটে যেতে লাগলো দিন, মাস, বছর। নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বই পড়ায় মনোনিবেশ করতে হয়। আর বর্ষ পরিক্রমায় আবারো ফিরে আসে বর্ষা। আর আমার জন্য ফিরে আসে দুর্ভোগ। সেই কষ্ট উপেক্ষা করে আবারো যেতে হয় আলোকিত জীবনের সন্ধানে বিদ্যালয়ে। এই সুখ-দুঃখের সংমিশ্রনেই শেষ হয়ে যায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ।


আজও মাঝে মাঝে মনে হয় সেই দিনগুলি। চোখের সামনে ভেসে উঠে বর্ষার রূপ, দুর্ভোগ। এখনো বাড়িতে গেলে বিকেল বেলায় ছুটে যাই ফেলে আসা সেই বিদ্যালয়ে। যেখানে মিশে আছে শৈশব ও কৈশোরের বহু স্মৃতি। এখন বিদ্যালয়ে কিছু পুরাতন ভবন আর নেই। ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন কিছু ভবন। ভেতরে লাগানো হয়েছে অনেক গাছ। করা হয়েছে ফুলের বাগান। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও একটি জিনিস এখনো নির্বিকার! সেই ছোটবেলায় যেমন দেখেছি, আজো এই কাসার ঘন্টাটি সেরকমই আছে! স্ব-মহিমায় আজো এটি কম্পিত হয় একই ব্যক্তির আঘাতে! আজো সেই ঘন্টাটির ধ্বনি পৌঁছে হাজারো শিক্ষার্থীর কানে। তাদের মনে না-ও জাগতে পারে যে এই ঘন্টার ধ্বনি একদিন কারো কানে পৌঁছবে না। কিন্তু আগের মতোই ঠিকই শশব্দে বেঁজে উঠবে। স্কুলের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় কখনো সেই ঘন্টাটির ধ্বনি কানে পৌঁছলে ফিরে যাই ফেলে আসা দিনে, স্মৃতিতে। আর নিজের অজান্তেই চোখের নিচে থমকে থাকে কয়েক বিন্দু নোনা জল....।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন