মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১০

গল্পঃ সোনালী স্বপ্ন ও বীভৎস বাস্তবতা

বর্ষাকাল থেকেই আলাপচারিতায় মুখর গ্রামটি। পরিবারের ছোটছোট ছেলেমেয়েরাও নিজ নিজ আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করছে। সাথীদের সাথে। সারাদিন মাছ ধরার পর বিকেলে বাজারে সেই মাছ বিক্রি করে কিছু টাকা দিয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করা আর বাকি টাকাগুলো সোনালী স্বপ্নে'র জন্য জমিয়ে রাখা।



দিন কাটতে লাগলো। চলে গেলো বর্ষা। মাছ ধরার সময় প্রায় শেষ বললেই চলে। কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে উপার্জনের জন্য চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ শাকসবজি চাষের চিন্তা করছে। যে যার মতো করে দিনাতিপাতের চেষ্টায়ই ব্যস্ত। আর প্রত্যেকেরই স্বপ্ন প্রায় অভিন্ন। শরতের আকাশখানি বেশ ঝলমলে। ছেলেমেয়েরা তাদের খেলাধুলায় মগ্ন। কেটে যাচ্ছে দিন। এগিয়ে আসছে প্রতিক্ষীত সময়। চলে আসলো হেমন্ত। সবার ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেছে। সবাই ধান পানিতে ভিজিয়ে রাখছে। কারো কারো বীজে অংকুর দেখা দিচ্ছে। হাওড়ে সবাই বীজ বপন করার জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজায় ব্যস্ত। কেউ কেউ দুর্বা ঘাসে ঢাকা স্থানেই বীজ বপন করছে ঘাসগুলি উপড়ে ফেলে। কেউ কেউ শক্ত মাটি কাদা করার জন্যে অনেক পথ হেঁটে নদী থেকে বালতি দিয়ে পানি আনছে। তৈরী করছে বীজতলা। বপন করছে বীজ।


কিছু দিন পর অংকুরগুলি সবুজ ঘাসে পরিণত হলো। সার দিয়ে কৃষকরা পরিচর্যা করতে লাগলো। অপরদিকে চলতে লাগলো জমি তৈরীর কাজ। গরুওয়ালা গৃহস্থের যেন বিশ্রাম নেই! লাঙলের ফাল কঠিন মাটির বুক ভেদ করে এগিয়ে যায়। গরুগুলি একটু দাঁড়িয়ে গেলেই হালচাষীর কণ্ঠে রে রে রে রে রে....।


আর এইদিকে ধানের চারাগুলো জমিতে রোপনের উপযুক্ত হয়ে গেছে। তাই ক্ষেতে বপন করায় সবাই ব্যস্ত। কিছুদিন পর বপন কাজ শেষ হয়ে এলো সবার। এবার সঠিক পরিচর্যার পালা। বাজারে লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকরা সার কিনছে। আর মুনাফাখোরদের লোভী চোখ ক্রমান্বয়ে নির্দয় হয়ে যাচ্ছে। বাড়িয়ে দিয়েছে সারের দাম। গরীব কৃষকদের টাকা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অপরদিকে পকেট ভারী হচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীদের।


শীতের প্রকোপ ক্রমশই বাড়ছে। হাড়কাপুনি শীত উপক্ষা করেই কৃষকেরা জেগে উঠছে। অন্যদিকে গৃহকত্রীও বসে নেই! ভোরে উঠে রান্নাবান্না শেষে স্বামীকে দুপুরের খাবারের পাত্র হাতে তুলে দিচ্ছে। আর কৃষক ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে তার কর্মস্থলে তথা স্বপ্ন পরিচর্যায়। দুপুর গড়িয়ে এলো। কিকেলের সূর্যটা প্রায় নিভুনিভু। তাই সবাই বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিরে এসেছে ঘরে। এবার গোসল সেরে ছেলে মেয়েকে নিয়ে উদও পূর্তি শেষে আবার নিদ্রায় এলিয়ে দিচ্ছে কান্ত দেহটা। অন্ধকারের ঘোর কমে যাচ্ছে। নিদ্রাকাতুর চোখের চাওয়া উপেক্ষা করে জেগে উঠছে কৃষক তাদের কর্মস্থলে তথা যাকে কেন্দ্র করে তাদের লালিত স্বপ্ন সেই স্থলে যাবার জন্যে।


ধানগাছগুলোর পাতার রঙ গাঢ় সবুজে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকেরও পরিচর্যার কমতি নেই। হঠাৎ তাদের ভাগ্যাকাশে শুরু হয় দুশ্চিন্তার ঘনঘটা। ফেটে যাচ্ছে জমি। কৃষকের চোখের কোণে টলমল করছে জল। পাতাগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি নেই! কৃষকের উচ্ছলতায় যেন ভাটা পড়ল। সোনালী স্বপ্ন চৌচির হবার শংকায় সবাই আতঙ্কিত। এমন সময় আকাশ থেকে দারুণ তোরে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির প্রবাহ সব ধুয়ে নিচ্ছে। কৃষকের মুখে উপচে পড়েছে হাসির বন্যা। এর কিছুদিন পর ধানগাছের পেটের ভেতর জন্ম নেয় ধানের শীষ। আর রাতে গ্রামের উম্মুক্ত জায়গায় বসে সবাই নিজ নিজ ক্ষেতের কথা একে অন্যের সাথে বলাবলি করছে।



ঐ দিকদিয়ে ধানগাছের পেট থেকে ধানের শীষ বেড়িয়ে গিয়েছে। ক্রমান্বয়ে সোনালী রঙে পরিণত হচ্ছে ধানের শীষ। অপরদিকে নদীর পানিও বাড়া শুরু করেছে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ধান পেকে আসছে। আর পানি বাড়ার সাথে সাথে নদীতে স্রোতের বেগও বাড়ছে। ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কাটার জন্য সবাই প্রস্তুত। আর সেই সাথে কিছুটা ভয়ও। আশা ও ভয়ের দোলাচলে সবাই মগ্ন। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাত পোহালেই ধান কাটতে হবে। তাই রাত না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। সকালে সবাই নৌকা নিয়ে রওনা হয়। নদীর পানি সবার কাছেই অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশী লাগছে। নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। জমির কাছাকাছি চলে যেতেই বুকটা কাঁপুনি দিল। হায়রে ভাগ্যের খেলা! সব ফসল নদীর পানিতে তলিয়ে গিয়েছে! সোনালী ধান আর দেখা যাচ্ছে না! থৈ থৈ করছে পানি আর পানি। সবার চোখ দিয়েই অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাকহীন সবাই। এক গভীর নিঃস্বব্ধতা যেন গ্রাস করেছে সবাইকে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে সবাই। এমতাবস্থায় চলে আসলো বিবর্ণ বিকেল। আঁধার ঘনিয়ে আসছে। তবু বাড়ি ফিরে যেতে কারোরই মন চাচ্ছে না। তারপরও বহু কষ্টে বাড়িতে ফিরে সবাই। মুখ গম্ভীর দেখে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শেষ! সব শেষ হয়ে গেছে। সমস্ত জমি পানিতে তলিয়ে গেছে! পুরো গ্রামেই কান্নার রোল পরে যায়। সমস্ত গ্রাম জুড়ে নেমে আসে সীমাহীন দুঃখ। আপরদিকে ভবিষ্যৎ কড়া নাড়ে দরজায়। ঘরে নেই কারোরই অন্নের সংস্থান। শুরু হয় তাদের অনাহারে জীবন-যাপন। পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরাও না খেয়ে থাকে। এদের ক্লীষ্টতা দেখে তাদের পিতা-মাতারা মাথা কুটে মরে। কিন্তু কোন উপায়ই ভেবে পায় না। দিন দিন অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। গ্রামের কিছু শিশু ও বৃদ্ধরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর জীবিতদের চোখে ভাসতে থাকে তাদের রঙিন স্বপ্নের কথা। ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মেলা থেকে হরেক রকমের খেলনা কেনার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সোনালী স্বপ্ন হয়ে যায় সবার কাছে এক বীভৎস বাস্তবতা.....।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন