ছেলেটি যত্ন-অযত্নের মাঝেই বেড়ে উঠে। দিনমজুর সগীর আলী’র ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ছুটতে হয় কাজের উদ্দেশ্যে। কোনদিন কাছে কাজ না পেলে হেঁটে যেতে হয় অনেক দূরে। অন্তত কোনরকমে খাবারের ব্যবস্থাটুকু তো করতে হবে? হাঁটতে থাকে। এমন সময় মনে পড়ে যায় ঘরে রেখে আসা দুধের বাচ্চার কথা। দশ বছরের এক বোবা ছেলের কথা। যে নিজের থেকে কোন কিছুই বুঝে না। খাবার দিলেও নিজে খেতে পারে না, খাইয়ে দিতে হয় তার কথা; তিন মেয়ের কথা। আর নিজের স্ত্রী তো আছেই। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই গিয়ে কাজে লাগে। দিনের শেষে মোটামুটি খাবারের ব্যবস্থা করে বাড়ি ফেরে। পরদিন আবারো ঠিক আগের মতোই বেরুতে হয় কাজের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কাজ পেলেও পারিশ্রমিক বরাবরের মতোই। দিনের শেষে কান্ত, শ্রান্ত, ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে আবারো বাড়ি ফেরে। আর ছোট ছেলেটির মুখের হাসির ঝিলিক দেখে সব দুঃখ ভুলে যায়।
এভাবেই দিন কাটতে থাকে। একসময় শুধু বুকের দুধে বাচ্চার চাহিদা মেটে না। দিনমজুর সগীর আলী’র মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্বল্প আয়ে এমনিতেই সংসার চলে না। তার উপরে যোগ হলো গুড়ো দুধ কেনার তাণ্ডব। ফলে আয়ের চাপ আরো বেড়ে যায়। দিগ্বিদিক ছুটতে হয়। কিন্তু না, বরাবরের পারিশ্রমিকের বেশী কোথাও কাজ পায় না! ফলে বাধ্য হয়েই মানুষের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিতে হলো। একপর্যায়ে আরো কিছু মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিতে লাগলো। কিন্তু এই ঋণ শোধ করার কেন উপায়ই সগীর আলী খুঁজে পেল না। আর ঐদিকে সুদের হার ঠিকই বেড়ে চলেছে। একপর্যায়ে নতুন করে কোন লোকই আর তাকে ঋণ দিতে চায় না। ঋণদাতা সবাই ঋণ পরিশোধ করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। ফলে ঋণ শোধ করার জন্য আদরের সন্তানকে রেখে বাধ্য হয়েই যেতে হলো অন্যত্র কাজ করার জন্য। সগীর আলী চলে যায় সিলেট। সেখানে দিনরাত অকান্ত পরিশ্যম করে পাথর ভাঙে। বাড়ির তুলনায় আয়ও হয় বেশ ভালো। একপর্যায়ে ৫ মাস পর বাড়ি ফেরে সকলের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দেয়।
এবার নিজ গ্রামেই একটি দোকানে ভালো অংকের উপার্জনের কাজ পেয়ে যায়। কিছুদিন পর আস্তে আস্তে পরিবারের চেহারাটাও পাল্টাতে থাকে। একদিন সগীর আলী নিজে গিয়েই বড় মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করায়। ফলে যোগ হয় বাড়তি খরচের পালা। যে টাকা উপার্জিত হয় তা দিয়ে কোনভাবে চলে যায় সংসারের খরচ। এভাবেই চলে যায় কয়েক বছর। পরে ছোট মেয়েকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। দেখতে দেখতে ছোট্ট ছেলেটিও বড় হয়ে যায়। এবার তাকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। অপরদিকে বড় মেয়েটি প্রাইমারী পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। আর ছোট মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণীতে উঠে। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। সুখ-দুঃখে মিশ্রিত সময় বয়ে যায় তাদের জীবনে। পার হয়ে যায় জীবন থেকে আরো কয়েকটি বছর।
একদিন কর্মস্থলের সামনে সগীর আলী দূর থেকে একটু ভিন্ন রূপ দেখল। কাছে গিয়ে দেখল কিছু মানুষের ভীড়। একজন অন্যজনের সাথে গুঞ্জন করে কথা বলছে। শুনল দোকান থেকে নাকি অনেক টাকা ও মালামাল চুরি হয়েছে। অবশ্য মাঝে মাঝে প্রয়োজনে সগীর আলীকে রাতে দোকানে থাকতে হতো। গতকাল রাতে সগীর আলী দোকানে ছিল। কিন্তু একজন লোক এসে বড় ছেলেটার অসুখের খবর শোনালে মধ্য রাতেই তিনি বাড়ি চলে যান। এই অবস্থায় একটু পরে মালিক এসে পৌঁছল। মালিক এই টাকা ও মালামাল চুরির জন্য সগীর আলীকে দায়ি করলো। ফলে পুলিশ সগীর আলীকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী নিরপরাধ সগীর আলীর ৫ বছরের জেল হয়। ফলশ্রুতিতে তার পরিবারের উপর নেমে আসে দুঃসহ বেদনার ছায়া। ক্রমান্বয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে থাকে তার পরিবার। তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ফুরিয়ে দু’বেলা ও পরে এক বেলাতে এসে দাঁড়ায়। তীব্র অভাবের দরুণ ছেলেমেয়েগুলোর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য সগীর আলী’র আদরের ছেলেকেই বাধ্য হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করতে হয়। দিন শেষে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনরকমে সংসার চলে।
এভাবে কিছুদিন নিজ গ্রামে বিক্রি করার পর একটু বাড়তি আয়ের আশায় চলে আসে শহরে। সেখানে এক বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে ৬ জন সমবয়সীর সাথে রাত্রিযাপন করে। একদিন বিকেলে সহ-হকারদের সাথে বাজারে গিয়ে কিছু বাদাম কিনে আনে। রাত পোহাবার আগেই ঘুম থেকে উঠে বাদাম ভেজে দু’মুঠো অন্নজল খাবার পরেই বিক্রির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। একটু হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের গেইটের সামনে যেতেই দেখে ওর চেয়ে বয়সে অনেক বড় বড় কিছু হকার বাদাম বিক্রি করছে। ও সেখানে বসতে চাইলে তারা তাড়িয়ে দেয়। অন্যত্র গেলেও ঠিক একই অবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে হয়। দুপুরে কিছু খাবার পর আবার হাঁটতে থাকে বিভিন্ন স্থানে একটু ভালো বিক্রির জন্য। দিনের শেষে যান্ত্রিক শহরের জোনাকগুলো যখন জ্বলে উঠে তখন ল্যাম্পপোস্টের নীচে এসে বসে বিক্রির জন্য। রাত দশ টা অবধি বিক্রির পর আবার বস্তির নোংরা ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে আসে। এভাবে বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে নিজে কোনভাবে চলার পর বাকি টাকাগুলো বাড়িতে পাঠায়।
এভাবেই ছেলেটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। আর ভাবে, কতো রকমের মানুষ চারপাশে বাস করে। ভাবে, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের সময়টুকুতে জীবন ধারণের তাগিদে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী, রাহাজানি, ছিনতাই, ব্যবসা, চাকুরী, মুচি, কুলি কতো ধরনের কাজই না করতে হয়। আর সবকিছু ছাপিয়ে জীবন তার আপন গতিতেই এগিয়ে যায়। কখনো থমকে দাঁড়ায় না; কখনো থমকে দাঁড়ায় না ....।
এভাবেই দিন কাটতে থাকে। একসময় শুধু বুকের দুধে বাচ্চার চাহিদা মেটে না। দিনমজুর সগীর আলী’র মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্বল্প আয়ে এমনিতেই সংসার চলে না। তার উপরে যোগ হলো গুড়ো দুধ কেনার তাণ্ডব। ফলে আয়ের চাপ আরো বেড়ে যায়। দিগ্বিদিক ছুটতে হয়। কিন্তু না, বরাবরের পারিশ্রমিকের বেশী কোথাও কাজ পায় না! ফলে বাধ্য হয়েই মানুষের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিতে হলো। একপর্যায়ে আরো কিছু মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিতে লাগলো। কিন্তু এই ঋণ শোধ করার কেন উপায়ই সগীর আলী খুঁজে পেল না। আর ঐদিকে সুদের হার ঠিকই বেড়ে চলেছে। একপর্যায়ে নতুন করে কোন লোকই আর তাকে ঋণ দিতে চায় না। ঋণদাতা সবাই ঋণ পরিশোধ করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। ফলে ঋণ শোধ করার জন্য আদরের সন্তানকে রেখে বাধ্য হয়েই যেতে হলো অন্যত্র কাজ করার জন্য। সগীর আলী চলে যায় সিলেট। সেখানে দিনরাত অকান্ত পরিশ্যম করে পাথর ভাঙে। বাড়ির তুলনায় আয়ও হয় বেশ ভালো। একপর্যায়ে ৫ মাস পর বাড়ি ফেরে সকলের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দেয়।
এবার নিজ গ্রামেই একটি দোকানে ভালো অংকের উপার্জনের কাজ পেয়ে যায়। কিছুদিন পর আস্তে আস্তে পরিবারের চেহারাটাও পাল্টাতে থাকে। একদিন সগীর আলী নিজে গিয়েই বড় মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করায়। ফলে যোগ হয় বাড়তি খরচের পালা। যে টাকা উপার্জিত হয় তা দিয়ে কোনভাবে চলে যায় সংসারের খরচ। এভাবেই চলে যায় কয়েক বছর। পরে ছোট মেয়েকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। দেখতে দেখতে ছোট্ট ছেলেটিও বড় হয়ে যায়। এবার তাকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। অপরদিকে বড় মেয়েটি প্রাইমারী পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। আর ছোট মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণীতে উঠে। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। সুখ-দুঃখে মিশ্রিত সময় বয়ে যায় তাদের জীবনে। পার হয়ে যায় জীবন থেকে আরো কয়েকটি বছর।
একদিন কর্মস্থলের সামনে সগীর আলী দূর থেকে একটু ভিন্ন রূপ দেখল। কাছে গিয়ে দেখল কিছু মানুষের ভীড়। একজন অন্যজনের সাথে গুঞ্জন করে কথা বলছে। শুনল দোকান থেকে নাকি অনেক টাকা ও মালামাল চুরি হয়েছে। অবশ্য মাঝে মাঝে প্রয়োজনে সগীর আলীকে রাতে দোকানে থাকতে হতো। গতকাল রাতে সগীর আলী দোকানে ছিল। কিন্তু একজন লোক এসে বড় ছেলেটার অসুখের খবর শোনালে মধ্য রাতেই তিনি বাড়ি চলে যান। এই অবস্থায় একটু পরে মালিক এসে পৌঁছল। মালিক এই টাকা ও মালামাল চুরির জন্য সগীর আলীকে দায়ি করলো। ফলে পুলিশ সগীর আলীকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী নিরপরাধ সগীর আলীর ৫ বছরের জেল হয়। ফলশ্রুতিতে তার পরিবারের উপর নেমে আসে দুঃসহ বেদনার ছায়া। ক্রমান্বয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে থাকে তার পরিবার। তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ফুরিয়ে দু’বেলা ও পরে এক বেলাতে এসে দাঁড়ায়। তীব্র অভাবের দরুণ ছেলেমেয়েগুলোর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য সগীর আলী’র আদরের ছেলেকেই বাধ্য হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করতে হয়। দিন শেষে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনরকমে সংসার চলে।
এভাবে কিছুদিন নিজ গ্রামে বিক্রি করার পর একটু বাড়তি আয়ের আশায় চলে আসে শহরে। সেখানে এক বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে ৬ জন সমবয়সীর সাথে রাত্রিযাপন করে। একদিন বিকেলে সহ-হকারদের সাথে বাজারে গিয়ে কিছু বাদাম কিনে আনে। রাত পোহাবার আগেই ঘুম থেকে উঠে বাদাম ভেজে দু’মুঠো অন্নজল খাবার পরেই বিক্রির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। একটু হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের গেইটের সামনে যেতেই দেখে ওর চেয়ে বয়সে অনেক বড় বড় কিছু হকার বাদাম বিক্রি করছে। ও সেখানে বসতে চাইলে তারা তাড়িয়ে দেয়। অন্যত্র গেলেও ঠিক একই অবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে হয়। দুপুরে কিছু খাবার পর আবার হাঁটতে থাকে বিভিন্ন স্থানে একটু ভালো বিক্রির জন্য। দিনের শেষে যান্ত্রিক শহরের জোনাকগুলো যখন জ্বলে উঠে তখন ল্যাম্পপোস্টের নীচে এসে বসে বিক্রির জন্য। রাত দশ টা অবধি বিক্রির পর আবার বস্তির নোংরা ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে আসে। এভাবে বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে নিজে কোনভাবে চলার পর বাকি টাকাগুলো বাড়িতে পাঠায়।
এভাবেই ছেলেটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। আর ভাবে, কতো রকমের মানুষ চারপাশে বাস করে। ভাবে, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের সময়টুকুতে জীবন ধারণের তাগিদে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী, রাহাজানি, ছিনতাই, ব্যবসা, চাকুরী, মুচি, কুলি কতো ধরনের কাজই না করতে হয়। আর সবকিছু ছাপিয়ে জীবন তার আপন গতিতেই এগিয়ে যায়। কখনো থমকে দাঁড়ায় না; কখনো থমকে দাঁড়ায় না ....।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন