বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১০

তুমি ওখানে যেও না

তুমি জন্মেছ নর্দমার কোলে
যে গন্ধ নাসিকার কাছে পৌঁছুলে
একশ্রেণীর দু’পা ওয়ালাদের উদর হতে
উগরে আসতে চায় যে খাদ্যকণা;
অথচ, সেই গন্ধেই তুমি বিমোহিত হও!
তুমি বেড়ে উঠেছ যেখান হতে
সেখানে প্রতিদিন উড়ে আসে ক্ষুধার্ত পরভৃতের ঝাঁক
ছুটে আসে প্রভুহীন কুকুরের পাল,
আর সেখানেই কান্ত দিনের শেষে
অন্ধকার প্রলেপ লাগিয়ে দেয়
তোমর উজ্জ্বল দু'টো চোখের পাতায়।
তুমি এখানেই থেকো, এখানেই...
তুমি ওখানে যেও না-
ওখানে তুমি মুক্ত বাতাস পাবে না
ওখানে তুমি জীবন্ত প্রকৃতি পাবে না
ওখানে ছড়ানো আছে শুধু কৃত্রিমতা,
অবশ্য ওখানে যবার যোগ্যতাও তোমার নেই!
ওখানে থাকে একদল সুশীল
ওখানে থাকে একদল বিদগ্ধ সমালোচক
ওখানে থাকে একদল দূর দৃষ্টিসম্পন্ন চুক্ষুওয়ালা
ওখানে থাকে একদল অনলবর্ষী বক্তা
ওখানে থাকে একদল দরিদ্রপ্রেমিক
ওখানে থাকে একদল আত্মনিয়োগকারী
তুমি ওখানে যেও না-
ওখানে শোভা পায় চিত্রকর্ম
ওখানে শোভা পায় এ্যাকুরিয়াম
ওখানে শোভা পায় বনসাই
কিন্তু, তুমি কখনো ওখানে শোভা পাও না
কখনো না, কখনো না...।

স্মৃতিস্তম্ভের সম্মুখে

একগুচ্ছ রক্তিম ফুল হাতে নিয়ে গিয়েছিলাম স্মৃতিস্তম্ভের সম্মুখে।
আমি ফুলগুলি বেদিতে রাখতেই
আচমকা ভেসে এলো সম্মিলিত কণ্ঠস্বর,
যেন ত্রিশ লক্ষ মৃত প্রাণ একসঙ্গে সঞ্চারিত হলো
সমস্ত ওষ্ঠ একত্রিত হয়ে উচ্চারণ করলো
ফিরে যাও, তুমি ফিরে যাও-
আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তাঁরা আবারো একসঙ্গে শশব্দে উচ্চারণ করতে লাগলো
ফিরে যাও, ফিরে যাও-
তোমার হাতের ফুলগুলিতে সুমধুর গন্ধ নেই
আছে শুধু বিষাক্ত সৌরভ
তোমার কণ্ঠনালীতে আছে হায়নার স্বর
তোমার ঠোঁটে আছে তাজা রক্তের স্পৃহা
তোমার আঙুলে আছে নেকড়ের নখ
তোমার চোখে আছে শকুনেন দৃষ্টি
তোমার হৃদপিণ্ডে আছে কয়লার দাগ
তোমার পাকস্থলিতে আছে ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন।
তুমি ফিরে যাও, ফিরে যাও-
তুমি বেড়ে উঠেছ বিকৃত সময়ের গর্ভে
তুমি বেড়ে উঠেছ হরেক মুখোশের স্পর্শে
তুমি বেড়ে উঠেছ অস্ত্রের ঝন্ ঝন্ শব্দে
তুমি বেড়ে উঠেছ প্রতারণার জীবন্ত চিত্রে
তুমি বেড়ে উঠেছ মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনে।
তুমি ফিরে যাও, তুমি ফিরে যাও-
তুমি টুকরো টুকরো করছ মানচিত্র
তুমি কলঙ্কিত করছ পবিত্র পতাকা
তুমি বিকৃত করছ ইতিহাস
তুমি কেড়ে নিচ্ছ ক্ষুধার্তের অন্ন।
ফিরে যাও, তুমি ফিরে যাও-
আর কোনদিন এসো না এই স্তম্ভের সম্মুখে
আর কোনদিন না, আর কোনদিন না...
পারলে সে দিন এসো-
যে দিন তোমার ফুলে থাকবে সুমধুর গন্ধ
যে দিন তোমার কণ্ঠনালীতে থাকবে সুতীব্র প্রতিবাদ
যে দিন তোমার আঙুলে থাকবে শুভ্র নখ
যে দিন তোমার ঠোঁটে থাকবে স্নেহময় চুম্বন
যে দিন তোমার চোখে থাকবে সুদৃষ্টি
যে দিন তোমার হৃদপিণ্ডে থাকবে ত্যাগ
যে দিন তোমার পাকস্থলিতে থাকবে ক্ষুধা।
অতঃপর আমি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে
সেই আগের পথেই পা বাড়িয়ে দিই...।

যেইসব কুকুরেরা শেয়ালের বেশে

রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ে কুকুর; বাজারে গেলে চোখে পড়ে কুকুর,
ঘন জঙ্গলে সবুজ পাতার আড়ালেও কুকুর-
জাতিসংঘে কুকুর, ইউনেস্কোতে কুকুর
বিশ্ব ব্যাংকে কুকুর, সার্কে কুকুর
পার্লামেন্টে কুকুর, সচিবালয়ে কুকুর
জেলা পরিষদে কুকুর, উপজেলা পরিষদে কুকুর
থানায় কুকুর, ইউনিয়ন পরিষদে কুকুর, ভূমি অফিসে কুকুর
স্থানীয় ব্যাংকে কুকুর, বাসস্ট্যান্ডে কুকুর
মন্দিরে, মসজিদে, গীর্জায়, প্যাগোডায় কুকুর
কোথায় নেই কুকুরেরা? অর্থাৎ-
চারপাশে শুধু বাহারি রঙের
হরেক কুকুর আর কুকুর।
যেন এক কুকুর সাম্রাজ্য-
নির্বিঘ্নে প্রবল বেগে সবখানে চলে কুকুরেরা
আর প্রচণ্ড প্রতাপে করে যায় শাসন;
কুকুরের চিৎকারে আজ অতিষ্ট মানুষ।
দিন চলে যায়, ঋতু চলে যায়, বছর চলে যায়
কিন্তু বর্ণিল রঙের কুকুরেরা রয়ে যায় সবখানে।
তারা জন্ম দেয় কুকুরছানা
হিংস্রতায় বড় করে তোলে কুকুরছানা।
তাদের মৃত্যুতেও অপূর্ণ থাকে না তাদের স্থান,
দৌড়ে এসে প্রতিস্থাপিত হয় অন্য কুকুরেরা।
তারা মাঝে মাঝে সাময়িক সময়ের জন্য স্থানচ্যুত হয়ে যায়
তবুও তারা রয়ে যায় অপরিবর্তিত।
তারা লোম পাল্টায়, শেয়ালের বেশ ধারণ করে
কিন্তু তাদের-ই অজান্তে তারা কুকুর-ই থেকে যায়,
আর যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে
শেয়ালের বেশে, শেয়ালের বেশে...।

তোমার চোখের স্বপ্নগুলোতে আগুন

তুমি অনাবৃত পায়ে দাঁড়িয়ে আছো ময়দানে,
ধূসর চোখ তুলে তুমি চেয়ে আছো নীলিমার দিকে
অপসৃয়মান কালো মেঘের দিকে
তুমি চেয়ে আছো এবং চেয়ে আছো-
আগুনের স্পর্শে উলঙ্গ হয়ে যাওয়া বৃক্ষের দিকে
কয়লার মতো পুড়ে ছাই হয়ে পরে থাকা ফসলের দিকে।
তুমি চেয়ে আছো এবং চেয়ে আছো-
ফেলে আসা অতীতের দিকে
প্রবাহমান বর্তমানের দিকে
আলো-আঁধারির চাদরে মোড়া ভবিষ্যতের দিকে।
আর আমি চেয়ে আছি তোমার
হেঁ হেঁ, শুধুই তোমার চোখের ভিতর।
আমি দেখছি তোমার চোখের ভিতর-
চৈত্রের একপশলা বৃষ্টি
বৈশাখের ছড়ানো ফসল
আষাঢ়ের জলের প্রতিশ্রুতি
আশিনের একখণ্ড নীলাকাশ
পৌষের প্রতিক্ষীত উত্তাপ
ফাগুনের রাশি রাশি ফুল।
আমি দেখছি তোমার স্বপ্নগুলি অনলে আবৃত,
তোমার স্বপ্নে খেলা করে বর্ণিল আগুন-
লাল আগুন, নীল আগুন, কালো আগুন
আর, আর প্রতিরোধের এক আশ্চর্য আগুন!