বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০১০

পুরনো কক্ষপথে

প্রতিদিন উদ্গত অঙ্কুরের মতো
শত শত পা মাতৃগর্ভ হতে বেরিয়ে আসে
এই বাংলার বুকে।
পা-গুলো ক্রমান্বয়ে বলিষ্ঠ হয়
প্রতিনিয়ত সামনে ছুটে চলার জন্যে।
কিন্তু আমাদের কোটি কোটি পা
একই বৃত্তের ভেতরে হাঁটছে...
'৭১ থেকে ২০১০-এই সুদীর্ঘ সময়েও
আমরা সেই বৃত্ত অতিক্রম করতে পারি নি;
বারংবার আমরা কেবল ভুল সময়ে ফিরে যাই
অন্ধকার আমাদের অভ্যর্থনা জানায়
আমরা ভুল সময়ে ফিরে যাই।
আমাদের এতগুলো চোখ-
অথচ সেই চোখে কোনো সুদৃষ্টি নেই,
আমাদের এতগুলো হাত-
অথচ সেই হাতে কোনো প্রদীপ নেই,
কেবল বছরের পর বছর
অপব্যয়ী কল্পনার জগতে হাঁটতে, হাঁটতে
হাঁটতে, হাঁটতে পুরনো কপথেই হারিয়ে যাই...

'চলে যাচ্ছি' বলতে এসেছি

আমি তোমার শুভ্র চিবুকে
কোনো রক্তিম চিহ্ন এঁকে দিতে
কিংবা তোমার উরুর ওপর
সওয়ার হয়ে শঙ্খচক্র আঁকা
দ্বারে প্রবেশ করতে আসি নি,
কেবল 'চলে যাচ্ছি' বলতে এসেছি।
তোমার উদ্ধত স্তনের মতো
অসংখ্য গম্বুজ প্রার্থনালয়ের চূড়া,
তোমার কালো চুলের মতো
অসহায় বৃরে ওপর ঝুলে থাকা স্বর্ণলতা
দোল খায় মাতাল হাওয়ায়।
আমি না হয় সেখানেই
খুঁজে নেব রমণীর আকৃতি
মাংসের ঘ্রাণ...
আমি চলে যাব-
শাদা-কালো ইঁদুরের স্পর্শ অতিক্রম করে
যেখানে আমার জন্যে অপেমাণ
আশ্চর্য এক অন্ধকার...।

সমাবেশ

রাস্তার পাশেই হবে এক বিশাল সমাবেশ।
সমাবেশে আসবে অনেক খ্যাতিমান রাজনীতিক।
তাই আকাশে প্রজ্বলিত সূর্যের উত্তাপ উপেক্ষা করে
দুপুর থেকেই জড়ো হচ্ছে জনতা।
হাতে তাঁদের শত শত প্ল্যাকার্ড, পোস্টার ও ব্যানার
ধরে এগুচ্ছে ছাত্র, কৃষক ও মজুরেরা।
তাঁদের সবুজ ব্যানারে শোভা পাচ্ছে রক্তরঙ,
হলুদ ব্যানারে শোভা পাচ্ছে অন্ধকার,
আর আকণ্ঠ উচ্চারিত বলিষ্ঠ স্লোগান দিয়ে
অসংযত পায়ে ধেয়ে যাচ্ছে মঞ্চের দিকে।
লবনকণায় টুইটুম্বুর তাঁদের আপাদমস্তক,
তবুও দৃঢ় প্রত্যয়ে সবাই অপেক্ষমাণ।
ছায়া যখন দীর্ঘতর হলো-
তখন মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন রাজনীতিকরা।
তাঁরা একে একে দিয়ে চললেন তাঁদের নিজ বক্তব্য;
আর আমি অনেক দূরে দাঁড়িয়ে শুনছি
তাঁদের দায়িত্ববোধ হতে নিঃসৃত কথামালা।
কিন্তু কেন আমার হাতে কোনো প্ল্যাকার্ড কিংবা পোস্টার নেই
কেন আমি অনেক দূরে শুধু দাঁড়িয়ে আছি
এই সমাবেশে হাজার হাজার জনতার মধ্যেও
কারও কোনো সন্দিগ্ধ চোখ আমাকে দেখল না!
তাঁরা কেবল দৃঢ়চিত্তে শুনেই যাচ্ছে
অভ্যাগতদের বক্তৃতা:
দেশে ফসলের ন্যায্য মূল নেই
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, বখাটেদের উৎপাতে
অকালে নষ্ট হচ্ছে অনেক ছাত্রীর জীবন।
অথচ, এত এত বক্তার কণ্ঠস্বরের ভীড়ে
আলোচিত সমস্যাবলী সমাধানের উপায় নিয়ে
কোনো বক্তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না!
এই অজস্র জনতা সর্বদাই
কাজ ফেলে রেখে ছুটে আসে সকল সমাবেশে
কিন্তু তাঁরা জানে না যে-
রাজনীতিতে কোনো আগামীকাল নেই
যা আছে তার সবই গতকাল...

পিশাচদের ব্যূহে

আরে! আপনি এখানে যে?
এইতো একেক সময় একেক স্থানে
ভ্রমে-বিভ্রমে চলে আসি
কিন্তু কখনোই ডিঙোতে পারি না
পিশাচদের তৈরী অন্ধকারময়
কাঁটাযুক্ত ব্যূহ।
প্রতি মুহূর্ত পদদলিত হই,
বিকৃত নখের আঁচড়ে তবিত হই।
আচ্ছা, আপনি কি কখনো দেখেছেন-
পিশাচদের লোমশ কালো হাত?
ধারালো বিষাক্ত নখ?
কুশ্রী মুখবয়ব?
আমি দেখেছি-
হেঁ, হেঁ আমি দেখেছি;
দেখেছি তাঁদের তৃষিত ঠোঁট
হাঙরের মতো বড়ো বড়ো দাঁত
সর্পের মতো জিহ্বা
নেকড়ের মতো নির্দয় চোখ।
তাঁরা সহাস্যে ঘুরে বেড়ায়
এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে
যত্রতত্র খাঁমছে ধরে
নিরপরাধ মানুষের স্কন্ধ
আর মেতে ওঠে রক্তের বীভৎস হোলি খেলায়।
আমি দেখেছি তাঁদের আস্ফালন,
দেখেছি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর তাঁদের
সুস্পষ্ট অনুজ্জ্বল ছায়া;
দেখেছি ক্রন্দনরত সংবিধান।
আমি শুনেছি পিশাচদের কর্কশ স্বর।
আমরা এখনো পিশাচদের ব্যূহে আবদ্ধ;
হয়তো আপনি তা দেখেন না
অথবা আপনারা তা দেখেন না
কিংবা আমরা উভয়েই তা
দেখেও দেখি না, দেখেও দেখি না...

আপনারা কেন এখানে ভীড় জমিয়েছেন?

শুধু শুধু কেন আপনরা এখানে ভীড় জমিয়েছেন?
কেন একজনের গায়ের ওপর আরেকজন ধাক্কা দিচ্ছেন?
বিভ্রমহীন দৃষ্টিতে তো দেখতেই পাচ্ছেন-
একজন রুগ্ন বৃদ্ধ অর্ধনগ্ন শরীরে
রাস্তার পাশে শুয়ে মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছে।
এটা এতো উৎসুক দৃষ্টিতে দেখার কী হলো?
ওঁ মরে গিয়ে বেঁচে যাক, স্বস্তি পা'ক,
বেচারা জীবন বহন করেছে বহু বছর;
একটু পরেই তাঁর চিরমুক্তি মিলবে
এতে তো অবাক হবার কিছু নেই!
তাছাড়া এখানে কোনো বিনোদনেরও ব্যবস্থা নেই,
কিন্তু আপনারা কোন উৎসাহে এখানে দাঁড়িয়েছেন?
ওঁরা তো সংখ্যায় গোটাকয়েক নয়,
এমন অসংখ্য বেঁচে আছে
সারাবিশ্বে, বাংলাদেশে।
ওঁরা একে একে মরে গেলে
খাদ্যের তীব্র চাহিদা কমবে
মিছিল-মিটিং হলে বেশ ফাঁকা থাকবে
রাজনীতিকের ভোট কমবে
ধনীদের কিছু টাকার সঞ্চয় হবে
আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার ওপর চাপ কমবে
সরকারের বাৎসরিক ব্যয় কমবে।
ওঁরা মরে গেলে আর কী কী হবে
তা বলতে না পারলেও
অন্তত এটুকু বলতে পারি যে-
আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হবে না।
তাই আমি আবারো বলছি
শুধু শুধু আপনারা এখানে ভীড় না করে
আপন গন্তব্যের দিকে পা বাড়ান...

আমি ও একা

যোনী ছুঁয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম
উদ্গত অঙ্কুরের মতো
অভিশপ্ত রাত্রির শেষ প্রহরে;
আর বেড়ে উঠেছিলাম সবুজের উত্তাপে।
একদিন ভেসে গেলাম-
প্রবাহমান জলের ঘূর্ণিস্রোতে ভর করে
অচেনা জনপদের এক কোনে।
তটরেখায় পৌঁছে দেখি-
মৃদু কোলাহলে মগ্ন চতুরপার্শ্ব,
একবোরে জনবহুল না হলেও
কিছুতেই জনবিরল বলা যায় না!
ধাবমান অগ্নিশিখার মতো
নগ্ন পায়ের বিকৃত ছাপ
উত্তপ্ত বেলে মাটিতে এঁকে এঁকে
ক্রমশ সমুখে ধাবিত হই,
আর পেছনে নিভৃতে পরে থাকে-
অট্টহাসিতে ঘোরগ্রস্ত
শত শত বিকৃত পায়ের ছাপ।
ঠিক তখনো আমার সাথে
মাথা নীচু করে নিঃশব্দে
হেঁটেই যাচ্ছে শুধু 'একা'।