শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১০

আমি, তুমি ও সে

আমি বললাম, ইচ্ছে করলেই চলে যাওয়া যায়।
তুমি বললে, হ্যাঁ, দূরে থাকা যায় কিন্তু ভুলে থাকা সহজ নয়।।
সে বললে, “সহজ-কঠিন” আমরা মিশাই তারপর খুঁজি জীবন দিশা।
অতঃপর আমি বললাম, কেউ দেখে ঘুটঘুটে কালো কাছে কিংবা দূরে।
তুমি বললে, কেউ কেউ কালোতেই খুঁজে পায় আলো কিংবা আলোতেই কালো।
সে বললে, কেউ আবার “আলো-কালো” প্রতিস্থাপন করে এগিয়ে যায় দৃষ্টি পাড়ে।
আবার আমি বললাম, মুক্তি কিসে, বেঁচে থাকায় না মৃত্যুতে?
তুমি বললে, থেমে যাওয়াই মৃত্যু; আবার থেমে যাওয়াই বিশ্রাম।
সে বললে, কখনো মুক্তি মৃত্যু, কখনো মুক্তি বেঁচে থাকা;
দুটোই সাময়িক আবার অসাময়িক।
তারপর তুমি বললে, যথার্থ মুক্তি আত্মদৃষ্টিকোণে।
এবার আমি বললাম, গ্রহণেও সুখ, গ্রহণেও দুঃখ
আমরা জানি, আমারা জানি না...

অবিনশ্বর চেতনা

কি, খুব বেশী অবাক লাগছে?
হ্যাঁ, সেই তুমি এখনো...?
হ্যাঁ, সেই আমি এখনো
তখনো ছিলাম এই আমি-ই
কেবল আমাদের আমিত্বকে কেন্দ্র করে।
ঘটঘুটে কালো রাত্রির মধ্যেও
আজও হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে ফিরছি
আমাদের হারানো সেই আলোকবর্তিকা।
যে আলোকবর্তিকা তোমারা ছিনিয়ে নিয়েছিলে আর
আমাদের বুকে গেঁথে দিয়েছিলে অজস্র গ্রেনেড।
ভেবেছিলে তোমারা সারা জীবন সুখেই থাকবে;
কিন্তু না, আজ আমি কেবল তোমাকে জানাতে এসেছি
তোমাদের সেই পথ রুদ্ধ হয়ে আসছে।
ভালো করেই জেনে রাখো-
আমরা ক্রমশই জেগে উঠছি
আমারা ফিরিয়ে নিতে আসছি আমাদের আলোকবর্তিকা।
আরও জেনে রাখো-
আমারা কখনো মরি না, মরতে পারি না;
কেবলমাত্র কিছু সময়ের জন্য আমাদের আড়াল করা যায়।
আমরা প্রতি রাতেই জন্ম নিই
অসহায় দম্পতির সঙ্গমের ভিতর দিয়ে,
শীৎকার, চিৎকারের মধ্যে দিয়েই আমরা বেড়ে উঠি
ভূমিষ্ঠ হই, জ্বলে উঠি
জ্বেলে দিতে কালো রাত্রির বুকে
সত্য ও সুন্দরের আশ্চর্য প্রদীপ...।

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১০

তোমার চলে যাওয়াটা উচিৎ হয়নি

আজ রাত একটায় তুমি চলে গেলে।
আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই
তোমার রিষ্টপুষ্ট, সুঠাম দেহটা
ভূমিকম্পে ধ্বসে যাওয়া কোন ইমারতের মতো
লুটিয়ে পড়ল শক্ত মৃত্তিকার বুকে।
তারপর আমারা তোমার, শুধু তোমার
লুঠিয়ে পড়া নিষ্প্রভ দেহকে স্পর্শ করলাম,
হৃদপিণ্ডের কম্পন অনুভব করতে চাইলাম;
অতঃপর আমরা বুঝতে পারলাম
তুমি অভিমানে, নিভৃতে চলে গেলে।
আর সহসা আমাদের চোখের সামনে ফিরে আসতে লাগলো-
তোমার প্রণবন্ত কৌতুকালাপ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বয়সের তারতম্য ভুলে গিয়ে কিভাবে তুমি মেতে উঠতে
আমাদের সাথে হরেক খেলায়।
কিন্তু আজ তোমার সেই নিথর দেহটা আমাদেরই চোখের সামনে।
এভাবে তোমার চলে যাওয়াটা উচিৎ হয় নি...
একটা কচ্চপের আয়ুর তুলনায়
তুমিতো আরো কিছুদিন বাঁচতে পারতে?
না, আমরা তোমার এই চলে যাওয়াটাকে মেনে নিতে পারছি না
তুমি তো কোন তস্কর, মাতাল কিংবা জুয়ারী ছিলে না,
তবে তুমি কেন এতো শীঘ্রই চলে গেলে?
তুমি জানতে বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোড় এক বছর।
কিন্তু তুমি এও জেনে রাখো-
তুমি বেঁচে থাকবে আমাদের স্মৃতিতে
অন্তত আট হাজার সাতশত ষাট ঘন্টার চেয়ে বেশী।
আমারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না, পারছি না;
তোমার এভাবে চলে যাওয়াটা উচিৎ হয়নি, উচিৎ হয়নি, উচিৎ হয়নি....।

শীতের রাতে

শিশিরের শব্দের মতো দিন চলে যায়
নিঃশব্দে কালো রাত চলে আসে,
মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে
অন্ধকার কক্ষেই তাকিয়ে থাকি;
কোন অস্বস্তি কিংবা শীতলতা বোধ করি না।
হঠাৎ বিছানার পার্শ্বে হাত দিয়ে চমকে উঠি!
মনে হয় শুভ্র পেঁজা বরফ বিছানো....
ঠিক তখনই অবচেতন মনের মাঝে হারিয়ে যাই,
মনে পড়ে, আমার কাঁধে অর্পিত দায়িত্বের কথা।
অথচ, আমি রঙিন কম্বলের আচ্ছাদনে আবিষ্ট
উষ্ণ পানির ছোঁয়ায় আমার গা ভিজে প্রতিদিন।
ঠিক আমার বিপরীতে কতো শীতার্ত খোলা আকাশের নীচে
কেবল ঠান্ডা কুয়াশার চাদর গায়ে নিয়ে শুয়ে আছে;
নেই তাদের কোন রঙিন কম্বল কিংবা
গায়ে উষ্ণ পানির ছোঁয়া!
কিন্তু আমার চারপাশে তো সবই বিদ্যমান....?
তবুও নিজের প্রতি কোন ক্রোধ কিংবা ঘৃণা জন্মায় না।
এমন সময় আমি আমার সচেতন মনের মাঝে ফিরে আসি,
ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলে যায়।
মানবপ্রেমের দ্বার চোখের সামনে উন্মোচিত হয়....
এইতো, আর একটু পরেই অন্ধকার কেটে যাবে,
সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল চলে আসবে।
ঠিক তখনই শীতার্ত মানুষের সম্মুখে তাদেরকেই কেন্দ্র করে
উষ্ঠ ও জ্বিহ্বার সমন্বয়ে উচ্চারণ করব দরদমাখা কিছু কথা,
আর পৌঁছে যাব শীতার্তদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার স্রোতে।
তাদের কিছু হোক আর না-ই হোক, তাতে কী?
আমি তো ঠিকই নির্লজ্জভাবে উপলব্দি করছি
আমার কাঁধে দায়িত্ব নেই, দায়িত্ব নেই
আমি মুক্ত, মুক্ত এবং মুক্ত...।

গল্পঃ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এক কিশোরের যত্রা

ছেলেটি যত্ন-অযত্নের মাঝেই বেড়ে উঠে। দিনমজুর সগীর আলী’র ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ছুটতে হয় কাজের উদ্দেশ্যে। কোনদিন কাছে কাজ না পেলে হেঁটে যেতে হয় অনেক দূরে। অন্তত কোনরকমে খাবারের ব্যবস্থাটুকু তো করতে হবে? হাঁটতে থাকে। এমন সময় মনে পড়ে যায় ঘরে রেখে আসা দুধের বাচ্চার কথা। দশ বছরের এক বোবা ছেলের কথা। যে নিজের থেকে কোন কিছুই বুঝে না। খাবার দিলেও নিজে খেতে পারে না, খাইয়ে দিতে হয় তার কথা; তিন মেয়ের কথা। আর নিজের স্ত্রী তো আছেই। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই গিয়ে কাজে লাগে। দিনের শেষে মোটামুটি খাবারের ব্যবস্থা করে বাড়ি ফেরে। পরদিন আবারো ঠিক আগের মতোই বেরুতে হয় কাজের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কাজ পেলেও পারিশ্রমিক বরাবরের মতোই। দিনের শেষে কান্ত, শ্রান্ত, ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে আবারো বাড়ি ফেরে। আর ছোট ছেলেটির মুখের হাসির ঝিলিক দেখে সব দুঃখ ভুলে যায়।


এভাবেই দিন কাটতে থাকে। একসময় শুধু বুকের দুধে বাচ্চার চাহিদা মেটে না। দিনমজুর সগীর আলী’র মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্বল্প আয়ে এমনিতেই সংসার চলে না। তার উপরে যোগ হলো গুড়ো দুধ কেনার তাণ্ডব। ফলে আয়ের চাপ আরো বেড়ে যায়। দিগ্বিদিক ছুটতে হয়। কিন্তু না, বরাবরের পারিশ্রমিকের বেশী কোথাও কাজ পায় না! ফলে বাধ্য হয়েই মানুষের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিতে হলো। একপর্যায়ে আরো কিছু মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিতে লাগলো। কিন্তু এই ঋণ শোধ করার কেন উপায়ই সগীর আলী খুঁজে পেল না। আর ঐদিকে সুদের হার ঠিকই বেড়ে চলেছে। একপর্যায়ে নতুন করে কোন লোকই আর তাকে ঋণ দিতে চায় না। ঋণদাতা সবাই ঋণ পরিশোধ করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। ফলে ঋণ শোধ করার জন্য আদরের সন্তানকে রেখে বাধ্য হয়েই যেতে হলো অন্যত্র কাজ করার জন্য। সগীর আলী চলে যায় সিলেট। সেখানে দিনরাত অকান্ত পরিশ্যম করে পাথর ভাঙে। বাড়ির তুলনায় আয়ও হয় বেশ ভালো। একপর্যায়ে ৫ মাস পর বাড়ি ফেরে সকলের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দেয়।


এবার নিজ গ্রামেই একটি দোকানে ভালো অংকের উপার্জনের কাজ পেয়ে যায়। কিছুদিন পর আস্তে আস্তে পরিবারের চেহারাটাও পাল্টাতে থাকে। একদিন সগীর আলী নিজে গিয়েই বড় মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করায়। ফলে যোগ হয় বাড়তি খরচের পালা। যে টাকা উপার্জিত হয় তা দিয়ে কোনভাবে চলে যায় সংসারের খরচ। এভাবেই চলে যায় কয়েক বছর। পরে ছোট মেয়েকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। দেখতে দেখতে ছোট্ট ছেলেটিও বড় হয়ে যায়। এবার তাকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয়। অপরদিকে বড় মেয়েটি প্রাইমারী পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। আর ছোট মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণীতে উঠে। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। সুখ-দুঃখে মিশ্রিত সময় বয়ে যায় তাদের জীবনে। পার হয়ে যায় জীবন থেকে আরো কয়েকটি বছর।


একদিন কর্মস্থলের সামনে সগীর আলী দূর থেকে একটু ভিন্ন রূপ দেখল। কাছে গিয়ে দেখল কিছু মানুষের ভীড়। একজন অন্যজনের সাথে গুঞ্জন করে কথা বলছে। শুনল দোকান থেকে নাকি অনেক টাকা ও মালামাল চুরি হয়েছে। অবশ্য মাঝে মাঝে প্রয়োজনে সগীর আলীকে রাতে দোকানে থাকতে হতো। গতকাল রাতে সগীর আলী দোকানে ছিল। কিন্তু একজন লোক এসে বড় ছেলেটার অসুখের খবর শোনালে মধ্য রাতেই তিনি বাড়ি চলে যান। এই অবস্থায় একটু পরে মালিক এসে পৌঁছল। মালিক এই টাকা ও মালামাল চুরির জন্য সগীর আলীকে দায়ি করলো। ফলে পুলিশ সগীর আলীকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী নিরপরাধ সগীর আলীর ৫ বছরের জেল হয়। ফলশ্রুতিতে তার পরিবারের উপর নেমে আসে দুঃসহ বেদনার ছায়া। ক্রমান্বয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে থাকে তার পরিবার। তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ফুরিয়ে দু’বেলা ও পরে এক বেলাতে এসে দাঁড়ায়। তীব্র অভাবের দরুণ ছেলেমেয়েগুলোর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য সগীর আলী’র আদরের ছেলেকেই বাধ্য হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করতে হয়। দিন শেষে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনরকমে সংসার চলে।


এভাবে কিছুদিন নিজ গ্রামে বিক্রি করার পর একটু বাড়তি আয়ের আশায় চলে আসে শহরে। সেখানে এক বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে ৬ জন সমবয়সীর সাথে রাত্রিযাপন করে। একদিন বিকেলে সহ-হকারদের সাথে বাজারে গিয়ে কিছু বাদাম কিনে আনে। রাত পোহাবার আগেই ঘুম থেকে উঠে বাদাম ভেজে দু’মুঠো অন্নজল খাবার পরেই বিক্রির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। একটু হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের গেইটের সামনে যেতেই দেখে ওর চেয়ে বয়সে অনেক বড় বড় কিছু হকার বাদাম বিক্রি করছে। ও সেখানে বসতে চাইলে তারা তাড়িয়ে দেয়। অন্যত্র গেলেও ঠিক একই অবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে হয়। দুপুরে কিছু খাবার পর আবার হাঁটতে থাকে বিভিন্ন স্থানে একটু ভালো বিক্রির জন্য। দিনের শেষে যান্ত্রিক শহরের জোনাকগুলো যখন জ্বলে উঠে তখন ল্যাম্পপোস্টের নীচে এসে বসে বিক্রির জন্য। রাত দশ টা অবধি বিক্রির পর আবার বস্তির নোংরা ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে আসে। এভাবে বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে নিজে কোনভাবে চলার পর বাকি টাকাগুলো বাড়িতে পাঠায়।


এভাবেই ছেলেটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। আর ভাবে, কতো রকমের মানুষ চারপাশে বাস করে। ভাবে, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের সময়টুকুতে জীবন ধারণের তাগিদে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী, রাহাজানি, ছিনতাই, ব্যবসা, চাকুরী, মুচি, কুলি কতো ধরনের কাজই না করতে হয়। আর সবকিছু ছাপিয়ে জীবন তার আপন গতিতেই এগিয়ে যায়। কখনো থমকে দাঁড়ায় না; কখনো থমকে দাঁড়ায় না ....।

দিয়ে দাও আমার প্রাপ্যটুকু

দিয়ে দাও আমার প্রাপ্যটুকু
একটু বেশী নয়; তার চেয়ে একটু কমও নয়
ঠিক যতটুকুতে আমার অধিকার।
কোন ত্রাস সৃষ্টি করে নয়,
কোন তস্কর, মহাজনের মতো অবিচার করেও নয়।
কোন রাজনীতিবিদের মতো দেশপ্রেমের
বাঁধ ভাঙা বক্তৃতা দিয়ে গলা ফাটিয়ে,
মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে জনতাকে
ধোঁকায় নিমজ্জিত করেও নয়।
কিংবা কোন সম্পাদক ও বেশ্যার দালাল সেজে;
কেবল সৎ ঘামে ভেজা শরীরের মূল্যটুকু দাও।
আমাকে বাধ্য করোনা হিংস্র হতে,
আমি হিংস্র হয়ে গেলে রক্তের নেশায় উন্মাদ হবো;
তাই সেই রক্তের স্রোত দেখার আগেই
এখনো সময় আছে, সঠিক সিদ্ধান্ত নাও।
এ আমার কোন অন্যায্য দাবি নয়,
শধুমাত্র চাইছি আমার প্রাপ্যটুকু.....।

রাজনীতি

তুমি করছ চুরি
আমি করছি পাহাড়াদারি
আমি করছি চুরি
তুমি করছ পাহাড়াদারি।
ভুলে গিয়ে দায়বোধ
করে যাচ্ছি শুধুই লুট।
ভালোভালো কথা বলে
জনমত আনতে নিজের দলে
উচ্চারণ করি আপন মনে;
বিরোধী দল করেছে এই, সেই
আমরা কোন অপকর্মে নেই।
মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তলেতলে
করে থাকি ফন্দি,
কেউ যদি জেনে যায়
করি তাকে বন্দী।
নিজের দোষ ঢাকতে
প্রয়োগ করে শক্তি
অন্যের উপর চাপিয়ে তা
নিজে পেতে চাই মুক্তি।
আর নির্বাচনে যে যার মতো
করে থাকি পণ,
কিন্তু বাঁচার জন্য প্রত্যেকেরই
যুক্তি থাকে নিজের মতন।

পাপ

অজস্র শাণিত তীরের ফলার
অগ্রভাগ নির্জনে হৃদয় বিদ্ব করে
ক্ষীণ ধারায় রক্ত ঝড়ায়।
শত ধ্যান নিভৃতে মাথা কুটে
দিগ্বিদিগ ঘুরে ফিরে আসে,
অতৃপ্ত আশার খাঁচায়।
উদভ্রান্ত গোবরে পোকার মতোই
সংবিৎ রুক্ষ একটুকরো ভূমিতে
হোঁছট খেয়ে পড়ে যায়।
চরম অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আর
টেনে-হিঁছড়ে নিয়ে যায় নির্জনতায়।
সীমাহীন অসমতল মৃত্তিকার উপর
গড়িয়ে যাওয়া কোন পাথরের মতো,
গুড়িয়ে যায় মন।
আর মুক্তির তীব্র বাসনা বারংবার
মুছে দিতে চায় অদৃশ্য কলুষিত ছাপ
পাপ, পাপ, পাপ।

কিছুই আসে যায় না

সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, দৃষ্টির আড়ালে
জল বেষ্টিত মৃত্তিকাটুকু
ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছে।
ভেঙে পড়ছে মাটির স্তুপ;
হাওয়া ও ঢেউয়ের উল্টোদিকে
দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধটি।
বোবা কান্নার শব্দ বাতাস
ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিচ্ছে উর্ধজগতে।
কুণ্ডুলীপাকানো স্রোতের মাঝে
একে একে খসে পড়েছে গাছপালা,
ভেসে যাচ্ছে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল।
পাখিগুলি উড়ে যাচ্ছে
পাতার আদরের সন্ধানে।
ঝর্ণার মতো জলধারা বইছে
নির্বাক বৃদ্ধর চোখে।
আর সে ভেসে গেলেই বা কি?
তাতে কারও কিছু আসে-যায় না।

সেই ঘন্টাটির ধ্বনি

উলঙ্গ শরীর ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠে। সেই সাথে বাড়ে দুরন্তপনা। পরিবার ও প্রতিবেশীদের হাতের কোমল ছোঁয়ায় কখনো পায় কান্না; আর কখনো পায় তীব্র আনন্দ। এভাবেই বেড়ে যায় বয়স। পিতা-মাতার চিন্তায় হঠাৎই স্থান পায় সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার কথা। সুন্দর ভবিষ্যতের কথা। আর তাই চঞ্চল সন্তানকে পাঠাতে হয় বিদ্যালয়ে। সন্তানের শত অনিহা থাকা সত্তেও বাধ্য হয়েই যেতে হয় বিদ্যালয়ে ভয়ার্থ মনে। কিছুদিন পর অনেক সহপাঠীর সাথেই সখ্যতা গড়ে উঠে। আবার ঝগড়া করে কান্নাভেজা চোখেও বাড়ি ফিরতে হয়। তবুও আবার পা বাড়াতে হয় সেই পথেই....।


এভাবেই দিন কেটে যায়। কেটে যায় মাস। আসে পরীক্ষা। পরিবর্তন হয় শ্রেণীর। আর জীবনের খাতা হতে কমে যায় হাসি-কান্নায় মিশ্রিত একটি বছর। আর সবার দৃষ্টিতে বয়স বাড়তে থাকে। সেইসাথে মাথায় আসতে থাকে দুষ্টু বুদ্ধি। সমবয়সীদের সাথে ঝগড়া, স্কুলে নালিশ, শিক্ষকের হাতের বেত্রাঘাত; সেইসাথে বাড়িতে বিচার। অতঃপর আবারো প্রহার। রাত পোহালেই যেতে হয় বিদ্যালয়ে। পড়া না পারলে আবারো শিক্ষকের বেত্রাঘাত। ফলে মস্তিস্কে এসে যায় ক্লাস ফাঁকি দেয়ার চিন্তা। ক্লাসের সময়টা খেলাধুলা করে কাটিয়ে দিয়ে তারপর বাড়ি ফেরা। মা জিজ্ঞেস করলে- “সব ক্লাস করে এসেছি।” পরের দিন স্কুল বন্ধ বলে না যাওয়া। এর পরের দিন স্কুলে গেলেই স্কুল ফাঁকি দেয়ার দায়ে আবারো শিক্ষকের হাতের প্রহার। এই খেলাতেই শেষ হয়ে যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ। ভর্তি হতে হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। শরীর ও মনে আসতে থাকে অনেক পরিবর্তন। সেইসাথে পড়ালেখার ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। আর সখ্যতা গড়ে উঠে অনেক নতুন নতুন বন্ধুবান্ধবের সাথে।


আমার বহু কষ্ট করেই যেতে হতো বিদ্যালয়ে। ফিরে আসতেও একই কষ্ট পোহাতে হতো। বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যেতো। কর্দমাক্ত পথে যে কতো কষ্ট করে পা ফেলতে হতো তার ইয়ত্তা নেই। হাতে থাকতো বইয়ের ব্যাগ; আর একটু এদিক-ওদিক হলেই কাদায় লুটোপুটি খেয়ে বাড়ি ফিরতে হতো। দুর্ভোগ সবচেয়ে চরমে উঠতো যখন বর্ষাকাল আসতো। স্কুলে যাবার কোন ব্যবস্থা থাকতো না। একদিকে অঝরে মেঘের কান্না, অন্যদিকে পারাপারের প্রতীক্ষায় এই বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা। হঠাৎ কোন মাঝিকে চোখে পড়লেই কণ্ঠনালী হতে প্রবল আনন্দে ধ্বনিত হতো- ও... ভাই..., নৌকা ভিড়াও। আর এর প্রত্যুত্তরে বাঝি বলতো- “না ইশকুলের এইদিকে যাইতাম না।” ফলে বাধ্য হয়েই ন্যাংটা হয়ে গামছা পড়ে বইগুলো হাতে নিয়ে অতি সতর্কতার সাথে সাঁতরিয়ে ডাঙায় উঠে ভেঁজা শরীরেই কাপড় পড়তাম। পরেই এক দৌড়।


ততক্ষণে কয়েকটা ক্লাস চলে গেছে। নতুন ক্লাস স্যার নেয়া শুরু করেছে। স্যার, আসি; বলতেই স্যার ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো- “এতো দেরি করে আসলে কেন? আর তোমার কয়েকটা ক্লাসও তো শেষ হয়ে গেছে।” কিছুণ চুপ করে দাঁড়িয়ে তারপর উত্তর- “স্যার, নৌকা পাইনি, তাই দেরি হয়ে গেছে।” স্যার বলতো- “ শুধু তোমারই তো প্রতিদিন দেরি হয়, আর কারো হয় না কেন? যাক, আস; আর যাতে কোনদিন দেরি না হয়।” এই সংলাপের দশ মিনিট পরেই ক্লাস শেষ। এর পরেই টিফিন। টিফিনের পরে আর দু’টো ক্লাস। ক্লাসগুলো শেষ। একটু পরেই বাঁজে ছুটির ঘন্টা। বাড়ি ফেরার পথেও আসার মতোই বিড়ম্বনা। আবারও ন্যাংটা হয়ে গামছা পড়ে বই হাতে নিয়ে সাঁতরিয়ে বাড়ি ফেরা।


পরের দিনও ঠিক একই কাণ্ড। শাস্তিস্বরূপ স্যার বাইরে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। ক্লাস শেষ হলে টিফিনের পর বাকি ক্লাসগুলো করে ছুটির ঘন্টা বাঁজার সাথেসাথেই পড়তে হয় আবারো বাড়ি ফেরার কষ্টে। এভাবেই সুবিধা-অসুবিধায় কেটে যেতে লাগলো দিন, মাস, বছর। নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বই পড়ায় মনোনিবেশ করতে হয়। আর বর্ষ পরিক্রমায় আবারো ফিরে আসে বর্ষা। আর আমার জন্য ফিরে আসে দুর্ভোগ। সেই কষ্ট উপেক্ষা করে আবারো যেতে হয় আলোকিত জীবনের সন্ধানে বিদ্যালয়ে। এই সুখ-দুঃখের সংমিশ্রনেই শেষ হয়ে যায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ।


আজও মাঝে মাঝে মনে হয় সেই দিনগুলি। চোখের সামনে ভেসে উঠে বর্ষার রূপ, দুর্ভোগ। এখনো বাড়িতে গেলে বিকেল বেলায় ছুটে যাই ফেলে আসা সেই বিদ্যালয়ে। যেখানে মিশে আছে শৈশব ও কৈশোরের বহু স্মৃতি। এখন বিদ্যালয়ে কিছু পুরাতন ভবন আর নেই। ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন কিছু ভবন। ভেতরে লাগানো হয়েছে অনেক গাছ। করা হয়েছে ফুলের বাগান। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও একটি জিনিস এখনো নির্বিকার! সেই ছোটবেলায় যেমন দেখেছি, আজো এই কাসার ঘন্টাটি সেরকমই আছে! স্ব-মহিমায় আজো এটি কম্পিত হয় একই ব্যক্তির আঘাতে! আজো সেই ঘন্টাটির ধ্বনি পৌঁছে হাজারো শিক্ষার্থীর কানে। তাদের মনে না-ও জাগতে পারে যে এই ঘন্টার ধ্বনি একদিন কারো কানে পৌঁছবে না। কিন্তু আগের মতোই ঠিকই শশব্দে বেঁজে উঠবে। স্কুলের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় কখনো সেই ঘন্টাটির ধ্বনি কানে পৌঁছলে ফিরে যাই ফেলে আসা দিনে, স্মৃতিতে। আর নিজের অজান্তেই চোখের নিচে থমকে থাকে কয়েক বিন্দু নোনা জল....।

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১০

গল্পঃ সোনালী স্বপ্ন ও বীভৎস বাস্তবতা

বর্ষাকাল থেকেই আলাপচারিতায় মুখর গ্রামটি। পরিবারের ছোটছোট ছেলেমেয়েরাও নিজ নিজ আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করছে। সাথীদের সাথে। সারাদিন মাছ ধরার পর বিকেলে বাজারে সেই মাছ বিক্রি করে কিছু টাকা দিয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করা আর বাকি টাকাগুলো সোনালী স্বপ্নে'র জন্য জমিয়ে রাখা।



দিন কাটতে লাগলো। চলে গেলো বর্ষা। মাছ ধরার সময় প্রায় শেষ বললেই চলে। কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে উপার্জনের জন্য চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ শাকসবজি চাষের চিন্তা করছে। যে যার মতো করে দিনাতিপাতের চেষ্টায়ই ব্যস্ত। আর প্রত্যেকেরই স্বপ্ন প্রায় অভিন্ন। শরতের আকাশখানি বেশ ঝলমলে। ছেলেমেয়েরা তাদের খেলাধুলায় মগ্ন। কেটে যাচ্ছে দিন। এগিয়ে আসছে প্রতিক্ষীত সময়। চলে আসলো হেমন্ত। সবার ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেছে। সবাই ধান পানিতে ভিজিয়ে রাখছে। কারো কারো বীজে অংকুর দেখা দিচ্ছে। হাওড়ে সবাই বীজ বপন করার জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজায় ব্যস্ত। কেউ কেউ দুর্বা ঘাসে ঢাকা স্থানেই বীজ বপন করছে ঘাসগুলি উপড়ে ফেলে। কেউ কেউ শক্ত মাটি কাদা করার জন্যে অনেক পথ হেঁটে নদী থেকে বালতি দিয়ে পানি আনছে। তৈরী করছে বীজতলা। বপন করছে বীজ।


কিছু দিন পর অংকুরগুলি সবুজ ঘাসে পরিণত হলো। সার দিয়ে কৃষকরা পরিচর্যা করতে লাগলো। অপরদিকে চলতে লাগলো জমি তৈরীর কাজ। গরুওয়ালা গৃহস্থের যেন বিশ্রাম নেই! লাঙলের ফাল কঠিন মাটির বুক ভেদ করে এগিয়ে যায়। গরুগুলি একটু দাঁড়িয়ে গেলেই হালচাষীর কণ্ঠে রে রে রে রে রে....।


আর এইদিকে ধানের চারাগুলো জমিতে রোপনের উপযুক্ত হয়ে গেছে। তাই ক্ষেতে বপন করায় সবাই ব্যস্ত। কিছুদিন পর বপন কাজ শেষ হয়ে এলো সবার। এবার সঠিক পরিচর্যার পালা। বাজারে লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকরা সার কিনছে। আর মুনাফাখোরদের লোভী চোখ ক্রমান্বয়ে নির্দয় হয়ে যাচ্ছে। বাড়িয়ে দিয়েছে সারের দাম। গরীব কৃষকদের টাকা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অপরদিকে পকেট ভারী হচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীদের।


শীতের প্রকোপ ক্রমশই বাড়ছে। হাড়কাপুনি শীত উপক্ষা করেই কৃষকেরা জেগে উঠছে। অন্যদিকে গৃহকত্রীও বসে নেই! ভোরে উঠে রান্নাবান্না শেষে স্বামীকে দুপুরের খাবারের পাত্র হাতে তুলে দিচ্ছে। আর কৃষক ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে তার কর্মস্থলে তথা স্বপ্ন পরিচর্যায়। দুপুর গড়িয়ে এলো। কিকেলের সূর্যটা প্রায় নিভুনিভু। তাই সবাই বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিরে এসেছে ঘরে। এবার গোসল সেরে ছেলে মেয়েকে নিয়ে উদও পূর্তি শেষে আবার নিদ্রায় এলিয়ে দিচ্ছে কান্ত দেহটা। অন্ধকারের ঘোর কমে যাচ্ছে। নিদ্রাকাতুর চোখের চাওয়া উপেক্ষা করে জেগে উঠছে কৃষক তাদের কর্মস্থলে তথা যাকে কেন্দ্র করে তাদের লালিত স্বপ্ন সেই স্থলে যাবার জন্যে।


ধানগাছগুলোর পাতার রঙ গাঢ় সবুজে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকেরও পরিচর্যার কমতি নেই। হঠাৎ তাদের ভাগ্যাকাশে শুরু হয় দুশ্চিন্তার ঘনঘটা। ফেটে যাচ্ছে জমি। কৃষকের চোখের কোণে টলমল করছে জল। পাতাগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি নেই! কৃষকের উচ্ছলতায় যেন ভাটা পড়ল। সোনালী স্বপ্ন চৌচির হবার শংকায় সবাই আতঙ্কিত। এমন সময় আকাশ থেকে দারুণ তোরে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির প্রবাহ সব ধুয়ে নিচ্ছে। কৃষকের মুখে উপচে পড়েছে হাসির বন্যা। এর কিছুদিন পর ধানগাছের পেটের ভেতর জন্ম নেয় ধানের শীষ। আর রাতে গ্রামের উম্মুক্ত জায়গায় বসে সবাই নিজ নিজ ক্ষেতের কথা একে অন্যের সাথে বলাবলি করছে।



ঐ দিকদিয়ে ধানগাছের পেট থেকে ধানের শীষ বেড়িয়ে গিয়েছে। ক্রমান্বয়ে সোনালী রঙে পরিণত হচ্ছে ধানের শীষ। অপরদিকে নদীর পানিও বাড়া শুরু করেছে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ধান পেকে আসছে। আর পানি বাড়ার সাথে সাথে নদীতে স্রোতের বেগও বাড়ছে। ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কাটার জন্য সবাই প্রস্তুত। আর সেই সাথে কিছুটা ভয়ও। আশা ও ভয়ের দোলাচলে সবাই মগ্ন। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাত পোহালেই ধান কাটতে হবে। তাই রাত না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। সকালে সবাই নৌকা নিয়ে রওনা হয়। নদীর পানি সবার কাছেই অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশী লাগছে। নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। জমির কাছাকাছি চলে যেতেই বুকটা কাঁপুনি দিল। হায়রে ভাগ্যের খেলা! সব ফসল নদীর পানিতে তলিয়ে গিয়েছে! সোনালী ধান আর দেখা যাচ্ছে না! থৈ থৈ করছে পানি আর পানি। সবার চোখ দিয়েই অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাকহীন সবাই। এক গভীর নিঃস্বব্ধতা যেন গ্রাস করেছে সবাইকে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে সবাই। এমতাবস্থায় চলে আসলো বিবর্ণ বিকেল। আঁধার ঘনিয়ে আসছে। তবু বাড়ি ফিরে যেতে কারোরই মন চাচ্ছে না। তারপরও বহু কষ্টে বাড়িতে ফিরে সবাই। মুখ গম্ভীর দেখে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শেষ! সব শেষ হয়ে গেছে। সমস্ত জমি পানিতে তলিয়ে গেছে! পুরো গ্রামেই কান্নার রোল পরে যায়। সমস্ত গ্রাম জুড়ে নেমে আসে সীমাহীন দুঃখ। আপরদিকে ভবিষ্যৎ কড়া নাড়ে দরজায়। ঘরে নেই কারোরই অন্নের সংস্থান। শুরু হয় তাদের অনাহারে জীবন-যাপন। পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরাও না খেয়ে থাকে। এদের ক্লীষ্টতা দেখে তাদের পিতা-মাতারা মাথা কুটে মরে। কিন্তু কোন উপায়ই ভেবে পায় না। দিন দিন অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। গ্রামের কিছু শিশু ও বৃদ্ধরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর জীবিতদের চোখে ভাসতে থাকে তাদের রঙিন স্বপ্নের কথা। ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মেলা থেকে হরেক রকমের খেলনা কেনার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সোনালী স্বপ্ন হয়ে যায় সবার কাছে এক বীভৎস বাস্তবতা.....।

গল্পঃ মুক্তমনের আড়ালে কিছু বিদ্বেষী

নির্জন একটি জায়গা। গাছপালায় ঘেরা। শত রকম পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় চারপাশ। ক্রমান্বয়ে এই জায়গাটি পরিণত হয় জনপদে। এখানের মানুষজন পালন করতে থাকে তাদের ধর্ম। বিচিত্র রকমের আচার ব্যবহারে ঘেরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি। তাদের মধ্যে রয়েছে শ্রেণী বৈষম্য। উঁচু জাত ও নীচু জাতের ফারাক তথা দুরত্ব। এই স্থানের মানুষ এই মিথ্যে বৈষম্য মেনে নিয়েই বসবাস করে চলছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে। কোন প্রতিবাদ নয়; কেবল তথাকথিত উঁচু জাত তথা জোঁক রক্ত শোষণ করে চলছে নীচু জাতের। এই জোঁকেরা ইশ্বরের ভয় দেখিয়ে নিজেদের অবস্থানকে বেশ ভালো পর্যায়ে-ই নিয়ে গেছে। অপরদিকে কথিত নীচু জাতেরা ধুঁকে ধুঁকে জীবন যাপন করে চলছে। তাদের এই বৈষম্য থেকে মুক্তির যেন কোন পথ নেই।


তাদের কিছু ধর্মীয় পুস্তক এমন যে তাদের মধ্যে এই তথাকথিত উঁচু জাতের লোকেরাই এগুলো পড়তে পারে। কঠিন ভাষায় লিপিবদ্ধ তাদের এই ধর্মীয় গ্রন্থ। এই উঁচু জাতের এরা যা বলে নীচু জাতের এরা তাই বিশ্বাস করে সত্যতা যাচাই না করেই। মনে করে এটাই ইশ্বরের হুকুম। এভাবেই চলতে হবে।


একদিন তাদের জনপদে কিছু নতুন লোক আসে। আগতরা তাদের ধর্ম পালন করতে থাকে। একপর্যায়ে এই স্থানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একটা অংশ আগতদের ধর্মে দীক্ষিত হয়! তখন পূর্বের ধর্মাবলম্বীরা এই নতুন ধর্মাবলম্বীদের ওপর চড়াও হয়। তারা বিভিন্নভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার করতে থাকে। তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে ফেলে। ফলে লেগে যায় এক তীব্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের দ্বারা অত্যাচারিত এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ ধর্মে অটল থাকে। তারা তাদের এই ধর্ম ত্যাগ করে না। বুকে আঁকড়ে পরে থাকে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মাবলম্বীরা ধর্মের নীতি প্রয়োগ করে যাপন করতে চায় তাদের এই ক্ষীণ জীবন। তারা “যার যার ধর্ম তার তার কাছে” কথাটি বিশ্বাস করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।


একসময় এই “উঁচু-নীচু” জাতে আচ্ছন্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মাবলম্বীর কিছু লোক ধর্মনিরপেক্ষতার চাদর পরিধান করে। তারা কৌশলে একটি ধর্ম তথা এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মের কুৎসা রটনা করতে থাকে। আর মুখে ধর্মনিরপেতার বুলি কপচায়। তাদের এই কর্মকাণ্ডের কথা শুনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের উঁচু জাতেরা তাদের ধর্মানুসারী সবাইকে নিয়ে অত্যাচারিত তথা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কি করা যায় এ বিষয়ে একটি গোপন বৈঠক করে। এই গোপন বৈঠকের কথা শুনে মুক্তমনের চাদরে আশ্রিত লোকেরা প্রেরণায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠে। তারা তাদের এই কাজের জন্য তাদের সম্প্রদায়ের কাছ থেকে টাকা পেতে থাকে। এই টাকার গন্ধ পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের আরো কিছু লোক মুক্তমনের চাদরে লুকায়িতদের সাথে যুক্ত হয়। আর ঐদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু ধূর্ত লোক যারা তাদের ধর্মের ক্রিয়াকলাপ পালন করে না; তারা তাদের মনোবৃত্তি এই ধর্মের আলোকে চরিতার্থ করতে না পারায় এই শ্রেণীর কিছু লোক মুক্তমনের ছদ্দাবরণে আচ্ছাদিত বিদ্বেষীদের সাথে মিশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মের বিরুদ্ধে মিথ্যে কুৎসা রটাতে থাকে। বিনিময়ে তারা পায় অনেক টাকা। একপর্যায়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আচরণে মুগ্ধ হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের আরো কিছু লোক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মে দিক্ষীত হয়। তারা সেই ধর্মের আলোকে জীবন গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। এতো অত্যাচারের পরেও এই স্থানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মাবলম্বীরা নিজ ধর্মের নীতি মেনে দৃপ্ত পায়ে শান্তির পথে পা বাড়িয়ে দেয়...।

বহিত জীবন

বিবর্ণ বিকেলের আভা
ঢেকে যায় আধাঁরের চাদরে।
তারাগুলি একে একে জ্বলে উঠে
নিঃশব্দে ঝরে পরে রূপালী চাঁদের জ্যোৎস্না।
নিদ্রায় ডুবে থাকে কান্ত দেহ।
ফুরিয়ে আসে আধাঁরের গাঢ়তা;
পূর্ব দিগন্তে উঁকি মারে লাল সূর্য।
স্বপ্নে বিভোর হয়ে জেগে উঠে ঘুমন্ত চোখ,
দরজায় কড়া নাড়ে নির্বিকার মন।
কেবল আশা’র ডানায় ভর করে এগিয়ে যায়
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে পূর্ণ বহিত জীবন।

পাহাড়ের চূড়ায়

হেঁটে যাই ঘন সবুজ গাছের ছায়ার ভেতর দিয়ে,
অবিশ্রান্তভাবে হেঁটে যাই পাহাড়ের বুক বেয়ে;
নত্রমণ্ডলীর মতো দৃশ্যমান চূড়ায়।
অপসৃয়মান মেঘের স্তুপ
গলে গলে ঝরে পরে সবুজ অরণ্যে;
ঝরে পরে ক্ষুধার্ত অগ্নিময় মাটিতে।
শুষে নেয় হাজারো নির্বাক নির্জীব প্রাণ।
আত্মপূর্ণতার জটিল সমাধানে মগ্ন জনতার কণ্ঠস্বর,
প্রতিধ্বণিত হয় কালের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা
বৈচিত্রময় পাহাড়ের গায়ে।
চলে যায় মর্ত্যলোক ছাড়িয়ে সুদূর দিগন্তে....
আমি তখনো একাকী দাঁড়িয়ে আছি
র্জীণ পাহাড়ের চূড়ায়।

দৃশ্যত নির্বাক ছবি

দৃষ্টি চলে যায় সুদূর অরণ্যে, দিগন্তে-
যেখানে ছড়ানো আছে বর্ণিল রঙ।
পাখিগুলি উড়ে যায় নীলিমার দিকে-
ডানায় মেখে আসে দ্যুতিময় রঙের চ্ছটা;
মেখে আসে সাদা মেঘের গন্ধ।
আকাশের নীল ও শস্যের সোনালী
মিশে যায় শিল্পীর তুলিতে,
আঁচড় কেটে যায় ক্যানভাসে।
সাক্ষ্য বহন করে প্রবাহমান সময়ের বুক চিরে
কালের আবর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার।
বহন করে দূর্বিষহ জীবনের ছাপ।
দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের মতো
কেবলি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে
প্রবাহমান সময়ের দিকে, সময়ের দিকে...

জীর্ণতা ছুড়ে ফেলে আসা; না কি পতিত হওয়া?

হেঁটে যাই বহু পথ। নত্রমণ্ডলীর আলোকে সাথী করে। কুয়াশা-ধোঁয়াশা ভেদ করে পৌঁছে যাই গন্তব্যে। পেছনে দৃষ্টি মেলে দিয়ে দেখি অতিক্রন্ত পথ ধারণ করে আছে চরণচিহ্ন। ঠিক যেন খোদাই করা কোনো শিল্পীর ভাস্কর্য। ইঙ্গিত দিচ্ছে কেবলই ফেলে আসা পথের, পূর্ণতার।



আমরা পূর্বেও মানুষ ছিলাম। বর্তমানেও আছি। এরইমধ্যে আমাদের মনুষত্য প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছি ধ্বংস ও সৃষ্টির ভেতর দিয়ে। কোথাও তীব্র ঝড়ে স্থবির হয়ে পড়ছে জীবন; আবার কোথাও ছুটে চলছে দুরন্ত ষাঁড়ের মতো জানা-অজানার বাঁকে।


বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আমরা বর্তমানে আধুনিক পৃথিবীর বাসিন্দা। নিত্যনতুন অত্যাধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টে যাচ্ছে জীবনপট। বৈচিত্রতায় ভরপুর আমাদের জীবন। নিজেদের বৈচিত্র করে তুলতেই আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা স্রোতের মতোই প্রবাহমান। ভেবে না ভেবেই আলো-আঁধারের মাঝেই মিশিয়ে দিচ্ছি জীবন; বর্তমান সময় থেকে অতীত সময় বিয়োগ না করেই। কেবল একদিকের দৃষ্টিপাতেই আমারা মুগ্ধ। ঠিক যেন আমাদের দ্বারা পূর্বে কোনো অপকর্মই হয়নি। ভুলে গেছি আমাদের গায়ে যে এখনো নগ্নতার চিহ্ন মিশে আছে। মিশে আছে প্রতি পরতে পরতে।


প্রাচীনকালে গাছের পাতা, ছাল-বাকল দিয়ে আধুনিকতায় উত্তীর্ণ আমরা লজ্জা নিবারণ করতাম। কাঁচা গোশত খেতাম। আজ আমরা সুসভ্যতার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কি দেখতে পাইনা সে সময়? হয়তো পাইনা। না পাবারই কথা। “দীর্ঘ দিনের সম্পর্কহীনতা যেমন শোকের তীব্রতাকে ভোঁতা করে
দেয়” - তেমনি আমরা ভুলেগেছি প্রাচীন জীবনাচারণ। ভুলে গেছি যে- “আমরা শুধু দ্রুত বেড়ে উঠি ক্ষয় হয়ে যাবার জন্যে”। প্রাচীন মানুষেরা গাছের পাতা, ছাল-বাকল দিয়ে লজ্জা নিবারণ করতো; আর আমরা আধুনিকতার ঝাণ্ডাধারীরা কি করছি? বর্তমানে আমাদের পোশাক কোন পর্যায়ে আছে? আমরা অতিক্রম করেছি না ফিরে যাচ্ছি সেই জীবনধারায়? আমাদের প্রাচীন মানুষের চেয়েওকি আমাদের কাপড়ের অভাব খুব তীব্র? তবে কি সীমাহীন নগ্ন পৃথিবীতে নগ্নতার চিহ্ন নিয়েই কি মিশে যাচ্ছি চির আধাঁরে? তবে কেনো আমরা সভ্যতার গর্বিতরা ব্যর্থ আস্ফালনে বলে উঠি হা- হতোম্বি???

সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১০

আজ নির্জন

জীবনের কতো দিনগুলি পেরিয়ে গেছে জীবন থেকে,
সেই দিনগুলি আজও স্বপ্ন হয়ে ভাসে চোখে।
বর্ণাঢ্য সেই দিনে সুনীল আকাশের বুকে অসংখ্য ঘুড়ি,
কতো রঙ-বেরঙের প্রজাপতির মুখরিত করে রাখা সুনীল আকাশ;
মাতাল হাওয়ায় ধূলোয় ধূসরিত হওয়া চারপাশ।
বাদলের অঝর ধারার মধ্যে স্নান করা,
সন্ধ্যায় সূর্যটা নিভে গেলে ঘরে ফেরা।
রাতের আকাশে হাজারও তারার মাঝে একখানি চাঁদ,
নয়নাভিরাম সেই দৃশ্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা;
জীবনের অমলিন সেই স্মৃতিগুলি মনের প্রকোষ্ঠে আজ নির্জন।

ভগ্ন প্রেম

জীবনে চলার পথে
কোন এক শুভ প্রাতে
হয়েছিল প্রেয়সীর সাথে দেখা।
সেই দিন হতে
প্রতিটি রাতে
মনে পড়েছিল তার কথা।
ভাগ্যের লিখনে
কোন এক ক্ষণে
আবার হলো দু'জনার দেখা।
সব ভাবনা ফেলে পাছে
চুপিচুপি এল কাছে,
মনের সমস্ত কথা আসিল মুখে
প্রেমের ফুল ফুটিল বুকে।
এভাবেই দিন যায়
মন শুধু তাকে চায়
নিরালায় বসিয়া;
আকাশ পানে চাহিয়া
স্বপ্ন বুনি মনে
প্রতি ক্ষণে।
একদিন চিঠি দিল মোর হাতে
অভিমানের ইঙ্গিতে।
লিখেছিল সে,
আমি চললুম দূর দেশে।
যেভাবে এসেছিল
সেভাবেই ভেসে গেল,
ছিঁড়ে গেল প্রেমের মালা
স্তব্ধ হয়ে গেলো গলা।
ভাবিল না মনে
আমি থাকিব কেমনে?
তাকে ছেড়ে
শূণ্য স্বপনের ঘরে।
মধুর সুর বাজিলনা বাঁশিতে
দূরে চলে গেলো হাসিতে হাসিতে;
আসিল না জীবনে আর শুভ লগ্ন
স্বঞ্চিত প্রেম হলো ভগ্ন।

আত্মগ্লানি

অন্ধকারে নিমজ্জিত চারপাশে
আলোর সন্ধানে এগিয়ে যায় প্রাণ।
অবিরাম ছুটে চলে, ছুটে চলে
জানা-অজানার বাঁকে.....
মাঝে মাঝে জোনাকির ক্ষীণ আলো
বিচ্ছুরিত হয় চারপাশে।
অতিক্রান্ত পথে কেবলই
ঘুটঘুটে অন্ধকারের ঘনঘটা।
ঘন জঙ্গলে সবুজ পাতার আদরে আচ্ছাদিত
হরেক রকম পাখি যেন ভ্রুকুটি করে।
সুতীব্র ঘৃণা আর ভালোবাসার মাঝে
দেখা যায় বিস্তর প্রভেদ।
জীর্ণ দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসে
ক্ষুধার্ত পিঁপড়ের দল।
যে প্রাণগুলি এখনো বেঁচে আছে
শুধু করছে তীব্র হতাশ ও তামাশা।
সীমাহীন নগ্ন, নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে
টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

পথে

দুপুরের ঝলমলে রোদে বেড়িয়ে
জনমানবের সমস্থ কোলাহল পেরিয়ে,
চলেছি দূর হতে দূরে অজানাতে
পথের প্রেমেই আমি আছি মেতে।


সূর্যটা নিভে গেলে থমকে দাঁড়াই
প্রণের গতি আমি মূহুর্তে হারাই,
ঘিরে ধরে আমায় সমস্ত ক্লান্তি
একে একে ধরা পড়ে সব ভুল-ভ্রান্তি।


বসে থাকি আমি একা সবুজ ঘাসের বুকে,
কালো মেঘ সরে গেলে চাঁদ পড়ে চোখে।
যা হারিয়েছি তা কি আমি পাব কোন প্রাতে,
আশা নিয়ে হাটি তাই এখনো সেই পথে।

অন্ধকারে ঢাকা

এই সমাজে
আমরা যারা আছি বেঁচে,
কেউ কি মোদের কাছে
পেয়েছে কী কোন প্রতিদান?
অনেক ঘুরেছি মোরা
মাঠ হতে মাঠে
বাট হতে বাটে;
কিছু কি দিয়েছি তুলে তাদের হাতে?
যে শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে
তিলে তিলে এ দেশ তুলেছে গড়ে,
যা তারা চেয়েছে
তা কী পেয়েছে?
এই প্রশ্ন নিয়েছি কী মোদের মনে
কোন এক ক্ষণে?
বাড়িয়েছি কি মোদের হাত
অবসান করতে তাদের কষ্টের দিন-রাত?
কতো রঙিন সাজে সেজে
এ ভুবন মাঝে,
করছি কতো অহংকার
ভেবেছি কি তা একবার?
মোরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে
আছি পরে একা,
কর্ণ,চুক্ষু দু'টোই মোদের
অন্ধকারে ঢাকা।

স্বপ্ন

মনের আল্পনার আঁকি
কতো মধুর স্বপ্ন,
যখন হয় পরিভ্রষ্ট
হৃদয় হয় ভগ্ন।
স্বপ্নগুলো কখনো
ডাকে হাতছানি দিয়ে মোরে
কাছে যেতে চাইলেই;
পাংশু হয়ে উড়ে যায় দূরে
মনের আকাশ অন্ধকার করে।
ভাবি, সববুঝি হলো মিছে,
ভাবতে, ভাবতে অবসন্ন হয়ে যায় দেহ;
দু'চোখে নেমে আসে অশ্রুর ফোয়ারা।
নিরাশার অথই জলে তলিয়ে যাই।
তবুও আবার মনে
অতি সঙ্গোপনে
জেগে উঠে রঙিন স্বপ্ন।

রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১০

সীমাবদ্ধতা

সীমান্তে ছিলাম আমি প্রহরী
কাটিয়েছি অনকে নির্ঘুম রাত।
উপভোগ করেছি কতো জোৎস্না;
দেখেছি চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ।
কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে আমি
যেতে পারিনি, যেতে পারিনি।


আমি দেশপ্রেমের সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত।
তাই বিশেষ দিনগুলি এলেই গর্জে উঠি,
সোচ্চার ধ্বণি দিয়ে গলা ফাটিয়ে
শহীদ মিনার কিনে নেই;
আর একাত্তরের সেই জঘন্য সংকলন।


আমি সবই করতে পারি।
পারি রাজনৈতিক দলের সাথে গিয়ে
শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিতে।
পারি দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করতে।
আর পারি স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগীদের
স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিতে।
এর বেশি আমি আর কিই-বা করতে পারি?


আমি জনতার কাছে অনলবর্ষী বক্তা হতে পারি।
মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আমি
জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতা হতে পারি।
জনতার চোখে ধূলো দিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল সম্পদ লুটে
নিজের অবস্থানকে শক্ত করে নিতে পারি।
আমি নিজ স্বার্থে আমার সিদ্ধান্ত
জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে পারি।


জাতির ক্রান্তিলগ্নে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারি;
আমি আমার পূর্বপুরুষের নাম
ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করতে পারি।
জনগণের এয়ারপোর্ট, স্টেডিয়াম ও সেতুগুলি
নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে
নামকরণ করতে পারি।


আমি আমার দেশের সার্বভৌমত্ব
তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে বিকিয়ে দিতে পারি।
জনগণকে পরাধীনতার শেকলে
আবদ্ধ করতে পারি।
আর অসীম সীমাবদ্ধতার মাঝেও
নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পারি।

মুছে দিয়ে

ভাবি মোদের মনে,
এগিয়েছি কী সমুখপানে
নাকি চলেছি পিছুর টানে?
প্রশ্নে বিদ্ধ করে মন
মগ্ন থাকি কিছুক্ষণ,
খুলেছি কি হিংসার আবরণ?
নাকি যেখানে ছিলাম দাঁড়িয়,
সেখানেই গেছি হারিয়?
হয়ে এসেছি কি পার,
সেই জীর্ণ দ্বার?
আলোর নেশায় ক্ষেপিয়ে মন
করেছি কি মোরা মুক্তির পণ?
এবার সব জীর্ণতা ছুঁড়ে ফেল
মোরা দলে দলে,
মুছে দিয়ে গ্লানি
নব সুর আনি।
এই ভুবন মাঝে
সকল কাজে
জীর্ণতার করি শেষ।
উদার চিত্তে
এই ধরণীতে
দু'হাত প্রসারিত করে;
আলিঙ্গনে ঘিরে
হৃদয়ে হৃদয় গেঁথে
থাকি মোরা একসাথে।

টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে তথাকথিত দেশপ্রেমিকদের এ কেমন নীরবতা???!!!

হে বিরাট নদী
অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল
অবিচ্ছিন্ন অবিরল
চলে নিরবধি।
(চঞ্চলা, রবিঠাকুর)

ভারতের উত্তর –পূর্বাঞ্চলীয় মনিপুর রাজ্যের বরাক ও টুইভাই নদীর সংযোগস্থল টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত। ২০১২ সালের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীনীতি লঙ্ঘন করে এ বাঁধ নির্মিত হলে বিপাকে পড়বে বাংলাদেশ।



ভারত বরাক নদীর পানি নিয়ন্ত্রন করার কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়বে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ মেঘনা অববাহিকা। মরুকরণ প্রক্রিয়ার শিকার হবে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের ৮ টি জেলা। ক্ষতিগ্রস্থ হবে প্রায় ২ কোটি মানুষ। বাঁধের ফলে একদিকে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে না, অন্যদিকে অসময়ে বাঁধের পানি ছেড়ে দেয়ার কারণে অকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এছাড়া প্লাবন পদ্মতি, ভূমিক্ষয়, ভূ-প্রকৃতির ওপর প্রভাব, ভূমিকম্পের প্রবণতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ুর ওপর এ বাঁধ বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

টিপাইমুখ বাঁধের অবস্থান-


বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসিদ সীমান্ত থেকে ১শ কিলোমিটার দূরে ভারতের মনিপুরের চারুচাঁদপুর জেল। এই জেলারই একটি স্থান টিপাইমুখ। এখানে মিলিত হয়েছে বরাক ও টুইভাই নদী। এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলের ৫শ মিটার ভাটিতে বরাক নদীতে নির্মিত হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ। বাঁধটির উচ্চতা হবে ১শ ৬১ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৩শ ৯০ মিটার। ২৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বাঁধের জলাধারে মোট পানির ধারণ ক্ষমতা হবে ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। ১৯৫৫ সালে মনিপুরের ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়ণধর, এরপর ভুবনধরে এ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে ১৯৮০ সালে স্থান নির্ধারণ করা হয় টিপাইমুখে। প্রথমে বাঁধটি ব্রম্মপুত্র ফাড কন্ট্রোল বোর্ড- বিএফসিবি’র আওতায় ছিল। ১৯৮৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বাঁধটিকে টিপাইমুখ পাওয়ার প্রজেক্টেও আওতায় নেয়া হয়। ১৯৯৯ সালে বাঁধটিকে দেয়া হয় নর্থ ইস্টার্ন ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন নেপকোর হাতে। ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং মনিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে বাঁধের উজান এবং ভাটি অঞ্চলের মনিপুরবাসীর বিরোধিতার কারণে বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারে নি ভারত। ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই মনিপুর রাজ্য সরকার আইন পাস করে টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত মনবাহাদুর রোডের প্রতি সাত কিলোমিটার অন্তর সামরিক পোস্ট স্থাপন করেছে।


বাংলাদেশের নদীর উপর প্রভাব-


বরাক নদীতে বাঁধেল ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশের নদীর পানিপ্রবাহ। হুমকির মুখে পড়বে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ মেঘনা নদীর অববাহিকা। কারণ, সিলেটের অমলসিদ পয়েন্ট থেকে দুভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বরাক নদী। একটি ভাগের নাম হলো সুরমা, অন্যটি কুশিয়ারা। ৩শ ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সুরমা ও ১শ ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কুশিয়ারা নদী হবিগঞ্জের মারকুলির কাছে প্রথমে কালনী নামে, পরে মেঘনা নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে। বরাকে ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে বাংলাদেশের মেঘনা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাবে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনডিপি’র এক গবেষণা অনুযায়ী (২০০৫) টিপাইমুখ বাঁধ হলে বরাক নদী থেকে অমলসিদ পয়েন্টে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীর দিকে পানিপ্রবাহ জুন মাসে ১০%, জুলাই মাসে ২৩%, আগস্ট মাসে ১৬% এবং সেপ্টেম্বও মাসে ১৫% কমে যাবে। অন্যদিকে এই বাঁধের ফলে কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা অমলসিদ পয়েন্টে জুলাই মাসের দিকে গড়ে ১ মিটারের বেশী, ফেঞ্চুগঞ্জে ০.২৫ মিটার, শেরপুর পয়েন্টে ০.১৫ মিটার ও মারকুলি পয়েন্টে ০.১ মিটার করে নীচে নেমে যাবে। বরাক, সুরমা ও কুশিয়ারা থেকে পানি প্রত্যাহারের হার শুকনো মওসুম আগস্ট মাসে ১৮% এবং সেপ্টেম্বর মাসে গিয়ে দাঁড়াবে ১৭ শতাংশ।


হুমকির মুখে প্লাবনভূমি-


টিপাইমুখ বাঁধের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্লাবনভূমি। স্বাভাবিক মওসুমে প্লাবনভূমিতে পানি পাওয়া যাবে না। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনডিপি’র তথ্যমতে, বাঁধের কারণে প্লাবনভূমির পরিমাণ সিলেট এলাকার শতকরা ২৬ ভাগ অর্থাৎ ৩০ হাজার ১শ ২৩ হেক্টর এবং মৌলভীবাজার এলাকার শতকরা ১১ভাগ অর্থাৎ ৫ হাজার ২শ ২০ হেক্টর কমে যাবে। আর বাঁধের কারণে পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্লাবনভূমির শতকারা ৭১ ভাগ এলাকা স্বাভাবিক মওসুমে জলমগ্ন হবে না। এয়াড়া কুশিয়ারা নদীর ডান পাশে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যে প্লাবনভূমি ওয়েছে তার পুরোটাই জলহীন হয়ে পড়বে। উজানে বাঁধ নির্মাণ করার কারণে প্লাবনভূমির প্লাবনের ধরন, মওসুম এবং পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্থ হবে।



বিশেষজ্ঞদের মতে, সুরমা ও কুশিয়ারা নদী তাদের উৎসস্থল থেকে মেঘনায় পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে পাঁচটি প্লবনভূমি অতিক্রম করেছে, বাঁধের কারণে তার সবকটিতেই প্রভাব পড়বে। ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও১মেঘনার অববাহিকার বিশাল এলাকার চাষাবাদের জমিগুলো উর্বরাশক্তি হারাবে। সুরমা ও কুশিয়ারায় প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ শুষ্ক হওয়ার ফলে কমপক্ষে ৭ টি জেলা- সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ব্রাম্মনবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় ধান উৎপাদন ব্যাহত হবে।

ভূমিক্ষয় ও ভূমির প্রকৃতির ওপর প্রভাব-


সাধারণত কোনো বাঁধের নীচ থেকে ভূমিক্ষয় শুরু হয়। টিপাইমুখ বাঁধের নীচ থেকেই ভূমিক্ষয় শুরু হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভূমিক্ষয় বাঁধ থেকে প্রায় ২শ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ভূমিক্ষয়ের কারণে ভাটি অঞ্চলের নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাবে। এর ফলে এমনিতেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হবে। এমনকি ভরা মওসুমে অর্থাৎ বর্ষাকালে পলি জমার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে বেশ কিছু শাখা নদীর মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার একদিকে কিছু অঞ্চলে একেবারেই পলি পড়বে না। অন্যদিকে কিছু কিছু অঞ্চলে পলির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে বর্ষাকালে নদীর পানি ধারণ করতে না পেরে অস্বাভাবিক বন্যার কবলে পড়বে গ্রামাঞ্চল ও আবাদি জমি।



বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নদীর পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়াতে মেঘনা অববাহিকায় লবণাক্ততা অতিরিক্ত হারে বেড়ে যাবে। কারণ, সমউচ্চতার সমুদ্রের পানির স্তরের দিকে লবণাক্ত পানি প্রবাহিত হয়। এরই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক পানির পরিমাণ কমে গেলে লবণাক্ত পানি আরও বেশী এলাকাকে লবণাক্ত করে ফেলে। সাধারণত দিনে দু’বার জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি নদীগুলোতে প্রবেশ করে। আবার ভাটার সময় নদীর পানি ঠেলে নোনা পানি সমুদ্রে পাঠিয়ে দেয়। বাঁধের কারণে নদীর পানি তলানিতে থাকলে জোয়ারের সময় যে নোনা পানি নদীতে উঠে আসবে নদীর পানি তা আর ঠেলে সমুদ্রে ফেলতে পারবে না। সমুদ্রের নোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে কৃষি জমিতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করবে। জাতিসংঘের সাবেক পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. খান বলেন, সমুদ্রের নোনা পানি নদীতে উঠে আসলে একই সঙ্গে পরিবেশ, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, সমুদ্রের নোনা পানি উঠে আসার ১০ বছর পর থেকে এর প্রতিক্রিয়া যাবে। আর ৫০ বছর পরে দেশের প্রায় ষাট ভাগ অঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাবে। কারণ শুধু বরাক নদীতেই নয় অন্য সব নদীতেই বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করে ভারত আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।


এদিকে নদীনালায় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির অভাবে বৃহত্তর সিলেটসহ আশপাশের এলাকায় নলকূপ বা গভীর নলকূপেও পানি সঙ্কট দেখো দিতে পারে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গড়ে প্রতি বছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৪ থেকে পাঁচ মিটার নীচে নেমে যায়। বৃষ্টিপাত ও বন্যার ফলে এই স্তর আবার উপরে চলে আসে। দেশের পূর্বাঞ্চলের জলধারাগুলো পানিতে ভরপুর না থাকলে এই সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ভূমিকম্পের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে-

পৃথিবীর ৬টি অতিভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে একটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। গত ২ শ বছরে টিপাইমুখ এলাকার আশপাশের ২শ কিলোমিটারে রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে শতাধিকবার। আর গত ১শ বছরে টিপাইমুখের ১শ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ১৭ বার। ১৮৯৭ সালে ঘটে যাওয়া গ্রেট আসাম ভূমিকম্পের ইতিহাস এখনো সেই ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সেখানে বাঁধের কারণে ভূমিকম্পের প্রবণতা অনেক বেড়ে যাবে।



সূত্র:- বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন অবলম্বনে।
28.06.2009

কামনা

আমি উন্মুক্ত আকাশের নীচে বাস করি
একটি শ্যামল গ্রামের মধ্যে।
সহজ, সরল লোকের মাঝে,
আত্মম্ভর অভিলাষ নিয়ে।
আমরা সরল জীবনের অধিকারী,
বেঁচে থাকতে প্রয়োজন হয় না বিলাসীতার।
অভাবের মাঝ থেকেই সুখের স্বপ্ন বুনি চোখে;
হঠাৎ দমকা বাতাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় স্বপ্নগুলি।
তবুও হৃদয় গভীরে থেকে যায় কিছু স্বপ্ন,
উজ্জ্বল দিনের আশার জেগে উঠবে বলে.......
কৃষ্ণ, সোনালী মুখে উপচে পড়বে হাসির বন্যা।
আমরা ভুলে যাব সব দুঃখ, ব্যাথা- বেদনা;
মোদের দুঃখময় জীবনে এটাই থাকে আত্মার কামনা।

হৃদয়ে হলো না গাঁথা

কি সব দিনগুলি আসে আমাদের দ্বারে
বছর ঘুরে ঘুরে?
কি-বা স্মরণ করিয়ে দেয়?
শুধু কি তাদের গর্বিত আত্মদান,
যারা এনেছে আমাদের জন্য স্বাধীনতা।
নাকি তাঁদের স্বপ্ন?


আমরা কতটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছি তাদের স্বপ্ন,
কখনো কি এই প্রশ্নে বিদ্ধ করেছি আমাদের হৃদয়?
আমরা কতটুকু দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে পেরেছি?
কিসের নেশায় আমরা মেতে আছি..........?
সব কালো কে আলো করার জন্যে,
নাকি সব আলো কে কালো করার জন্যে?
তবে কিসের প্রতিফলন ঘটাতে আমরা বেঁচে আছি?


লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ করেছে হৃদয় হরণ,
তাইতো তাঁদের স্বপ্নের কথা হয়না আমাদের স্মরণ।
তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা
এখনো হয়নি হৃদয়ে গাঁথা।

তাজমহল

সম্রাট শাজাহান
দিয়ে মনপ্রাণ
ভালবাসত যারে;
তার স্মৃতির তরে
গড়লেন ব্যয় করে অজচ্ছল
সেই তাজমহল।


ভারতের আগ্রাতে
পূর্ণিমা রাতে,
যা আজো করে জ্বলজ্বল
সেই তাজমহল।


আসে অসংখ্য লোক
ভরে দেখতে দু'চোখ
প্রেমের সাক্ষ্য হয়ে;
যা আজো আছে দাঁড়িয়ে
কালের স্রোতে সমুজ্বল
সেই তাজমহল।

অধিষ্ঠিত

কতো মানুষ আছে এ দেশে কতো বড় পদে,
সবাই তো আর প্রকৃত নয়; তবুও মানুষ বটে।
কেউবা করে খুনাখুনি; কেউবা রাহাজানি,
তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ হচ্ছে হয়রানি।


হৃদয় দিয়ে একবারও ভাবে না এ অন্যায় তাঁরা,
তারা চায় তাদের কাজ হোক কেবল সারা।
তারা চায় গড়তে তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ,
যেখানে থাকবে না তাঁদের অন্যায়, অত্যাচারের লেশ।


ভালো-ভালো কথা বলে; মানুষ আনবে নিজের দলে,
এই দেশেতে এই নাটকের হবেন না কোনো শেষ;
কোনো ভাবে অধিষ্ঠিত হতে পারলেই হলো বেশ!

বেঁচে থাকা

শুভ্র শীতল বরফের মতো,
ঠিক যেন বাকহীন শিশুর মতো;
চির শান্ত, স্তব্ধ নদীর মতো
কণ্ঠনালীতে গর্জে উঠে না সোচ্চার কোনো ধ্বনি।
কেবল অতিক্রান্ত দিনের শেষে
নিজেকে পূর্ণ করার বাসনা।
মেঘের ভেলার মতো ভাসতে থাকা ইচ্ছেগুলোকে,
স্বপ্নীল রঙে সাজানোর মোহে আবিষ্ট।
আর সবকিছু, সবকিছু দূরে রেখে
আত্মপূর্ণতার হিসেবে মগ্ন থাকা।
মাঝে-মাঝে চিৎকারকে মনে হয়
প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ ভাষা।
অতি ভয়ে বিচলিত হয়ে
ঔচিত্যবোধ থেকে দূরে থাকা।
আর প্রতিবাদ বিমুখ হৃদয় নিয়ে
আসলেই কি যায় বেঁচে থাকা?

কুকুরের স্বভাব ও আমার ভোগান্তি

যখন আমি একটু বুঝতে শিখেছি তখনি আমি দেখেছি আমাদের পাড়াতে অনেক কুকুরের আনাগোনা। সমবয়সীরা অনেকেই কুকুরের বাচ্চা নিয়ে খেলা করতো। নিজের ঘরে বেঁধে রাখত। কিন্তু আমি এসবের কিছুই করতাম না। কুকুরের প্রতি তাদের অত্যাচার দেখে কষ্ট পেতাম। ভাবতাম এই কুকুর যদি আমি হতাম, তবে এই অবস্থাতো আমারও হতো?



শৈশবে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন স্কুলে যাবার পথে দুটি বাড়ির কুকুর আমাকে আক্রমণ করত। মনে হতো যেন কনের বাড়ির গেট পেরিয়ে যাচ্ছি। একটি বাড়ির কুকুরের কাছ থেকে রেহাই পেলে আর একটু দূরে অন্য একটি বাড়ির আরও ৪ টি কুকুরের আক্রমণে পড়তাম। স্কুলে যাবার ৩ মিনিটের রাস্তা ৩৫ মিনিট লেগে যেত। ফিরে আসতেও ঠিক একই অবস্থা। এভাবেই দিন কাটতে লাগল। লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, ঐ কুকুরগুলি রাস্তায় পেলে আমাকে আক্রমণ করত না। যখনই কুকুরগুলির মালিকের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতাম তখনই কেবল আক্রমণ করত। এটাই ছিল ঐ কুকুরগুলির স্বভাব।


সমাজে ঠিক এমনই মানুষবেশী কুকুর আছে যাদের স্বভাবও এই কুকুরের মতোই। কুকুরগুলো যেমন মালিকের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে দেখলেই আক্রমণ করত; তেমনি মানুষবেশী কুকুরগুলোও এভাবেই আক্রমণ করে। তারাও সুযোগের অপেক্ষা করে কখন তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবে। আর এই মানুষবেশী কুকুরগুলিও এই সুযোগটাই ব্যবহার করে। তাদের ইচ্ছেমতো কামড়ে দেয়। কিন্তু শত কামড়েও তাদের কিছুই করা যায় না। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলেই এই কথাটি স্পষ্ট হয়ে যায়।


একদিন লক্ষ্য করলাম আমাকে কোনো কুকুরই আক্রমণ করছে না। আমি বেশ অবাক হলাম! পরে জানতে পারলাম ঐ কুকুরগুলি আর এখানে নেই। পরে শান্তিতে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে পারলাম। মনের আনন্দে স্কুলে আস-যাওয়া করলাম, আসা-যাওয়া করলাম, আসা-যাওয়া করলাম।

দৃষ্টি ভালো না হলে দৃশ্য ভালো লাগে না

দৃষ্টি জীবনে আনে সুখের বৃষ্টি। দৃষ্টি মানুষের মনে অনুভূতির মাত্রা প্রবল করে। এই দৃষ্টি দিয়েই আমরা দেখি প্রকৃতি। উপভোগ করি রূপ, রস, গন্ধ। দৃষ্টির প্রভাব পৃথিবীতে সর্বদাই বিরাজমান। কেউ কারো প্রেমে পড়ে দৃষ্টিতে। শিল্পীর শৈল্পীকতা ধরা পড়ে দৃষ্টিতে। আবার চোখের দৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় সকল সৌন্দর্য। প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে হলে প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টির। যাদের অন্তর্দৃষ্টি যত বেশী প্রবল, তারা তত বেশী সৌন্দর্য উপভোগকারী।



পৃথিবীতে দৃষ্টি'র বেশী অভাব না থাকলেও শুভ তথা অন্তর্দৃষ্টি'র অভাব লক্ষ্যনীয়। 'সভ্যতা ও সুসভ্যতা'র মাঝে যেমন বিস্তর প্রভেদ বিদ্যমান, তেমনি 'দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি'র মধ্যে তেমনি পার্থক্য বিদ্যমান। পর্যটক, ফটোগ্রাফার, চিত্র শিল্পী ও সত্যাণ্বেষীদের কাছে সর্বদাই শুভ তথা অন্তর্দৃষ্টি'র কদর বেশী। শিল্পী তার গভীর দৃষ্টি দিয়েই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলে অপরূপ ছবি। আর দর্শকরাও তেমনি সুন্দর দৃষ্টি দিয়েই দেখে তার আঁকা সেই ছবি।


দৃষ্টি মনের ওপর নির্ভর না করলেও শুভ তথা অন্তর্দৃষ্টি সর্বদাই মনে ওপর নির্ভরশীল। মনের গতিবিধির মাধ্যমেই অন্তর্দৃষ্টি আবর্তিত হয়। মন ভালো না হলে অনেক সুন্দর দৃশ্যও সুন্দর লাগে না। আবার, মন ভালো হলে অনেক সময় তেমন সুন্দর দৃশ্য না হলেও সুন্দর লাগে।


দৃষ্টিতে সবসময় ন্যায়-অন্যায় ধরা পড়ে না। ন্যায়-অন্যায় ধরা পড়ে অন্তর্দৃষ্টি'র মধ্যে দিয়ে। যার অন্তর্দৃষ্টি যত প্রবল সে তত বেশী সত্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করে। আবার অন্তর্দৃষ্টি'র কারণে অনেক মানুষ অপ্রিয় হয়ে যায়। তারা কেবল তাদের কাছেই অপ্রিয় হয় যারা শুধু মুখেমুখে সত্যের বুলি আওরায়। কেউ যদি তার গভীর দৃষ্টি দিয়ে কারো কোনো ভুল ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তখন তাকে আমরা বলি 'প্রতিক্রিয়াশীল'’। শুধু কি এ পর্যন্তই? না, তাতেও তারা ক্ষান্ত হয় না। যা ইচ্ছে তাই বলে বেড়ায়। ক্ষতি করতে উদ্যত হয়। অনেক প্রতিক্রিয়াশীল'রা নিজ স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে থেমে য়ায়। আবার অনেক প্রতিক্রিয়াশীল'রা কোনো কিছুতেই দমিত হয় না।


"তারা ভালোবাসে মানুষকে
ভালোবাসে আন্দোলন
ভালোবাসে চিন্তা করতে,
তাদের সংগ্রামকে তারা ভালোবাসে।"


এই প্রতিবাদীরা তথা প্রতিক্রিয়াশীলদের দোষ এখানেই যে, কেন তারা অন্যের ভুল ও অন্যায় তুলে ধরে। যখন কোনো ব্যক্তি কাউকে যা ইচ্ছে তাই বলে বেড়ায় বা বলে ফেলে; তখন সেই প্রতিবাদী বা সত্যভাষী ব্যক্তি যদি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তখন তথাকথিত প্রগতিশীল'রা এই সত্যভাষীকে নিন্দা ও ধিক্কার জানায়। তারা বলে উদ্দেশ্যমূলক মনোভাব নিয়েই নাকি এসব লিখে বা প্রতিবাদ করে। আবার অনেকের কাছে তার এই প্রতিবাদ দৃষ্টিকটুতে পরিণত হয়। বলতে গেলে এক পর্যায়ে চরমভাবেই উপেক্ষিত হয়। আবার যারা অন্তর্দৃষ্টি'র মাধ্যমে সত্য অনুধাবন করে বা করতে পারে তারা সর্বদাই দেয় এই ব্যক্তিকে বাহবা। এই সত্যভাষী'রা বা প্রতিক্রিয়াশীল'রা একটি কথাই বলে- "দুষ্টু লোকের কাছে দৃষ্টিকটু হলে বল কি করি?" আসলেই প্রগতিশীলতার মুখোশধারীদেরকে প্রতিক্রিয়াশীলদের তেমন কিছই বলার থাকে না। কিন্তু তারা সর্বদাই সত্য বলে যায়। যে ব্যক্তি যত বেশী সত্যভাষী, সে ব্যক্তি তত বেশী অপ্রিয় ও নির্যাতিত। এই প্রতিক্রিয়াশীল'রা জানে যে তারা এভাবে সর্বদাই উপেক্ষিত হবে। তবুও তারা নৈতিকতা ও বিবেকের তাড়নায় তাদের এই প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। এনেদিতে চায় চির শ্বাস্বত সত্যের অমিয় ধারা।


সকল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি'র। আর সত্য নামক সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে প্রয়োজন বিবেক তাড়িত অন্তর্দৃষ্টি'র। তবেই দৃষ্টির সার্থকতা।

আনতে হবে

হারিয়েছি অনেক কিছু
খুঁজে ফিরি তাই,
খুঁজে খুঁজে কান্ত আমি
তবুও খুঁজে বেড়াই।
চারিদিকে অনকে বাধা
তবুও এগিয়ে যেতে হবে,
জনতা যাতে না পড়ে ধাঁধায়
তাই সত্য আনতে হবে।
ছড়িয়ে দিতে হবে আলো
অন্ধকার করতে হবে দূর,
ঢেলে দিতে হবে সকল হৃদয়ে
সত্য ও সুন্দরের সুর।

প্রাচীন ও আধুনকি সভ্যতায় প্রাপ্তি

মানুষ যখন পৃথিবীতে অবতরণ করল তখন থেকেই সভ্যতার শুরু হতে লাগল। ঘটতে লাগল জীবন ও প্রকৃতির পরিবর্তন। এই পরিবর্তন কখনো ডেকে এনেছে ধ্বংস, আবার কখনো ডেকে এনেছে অপার সম্ভাবনার দোয়ার। সময়ের বিবর্তনে পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে আদিম মানব ও বর্তমানে যারা আছি তাদেরকে আমরা আধুনিক মানব বলি। এই "পূর্ব ও বর্তমান" এ দু'টি কথার মধ্যে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি জীবনমানের মধ্যেও ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। আদি মানুষেরা গাছের ফল, পাতা ও বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেয়ে জীবন ধারণ করত। থাকত খোলা আকাশের নীচে, পাহাড়ের গোহায়। ফলমূলের পাশাপাশি তাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন পড়ত বিভিন্ন প্রাণী শিকার করার। এই প্রয়োজনবোধে তারা তৈরী করেছিল বিভিন্ন অস্ত্র। শুধু শিকার করার জন্যই নয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও প্রয়োজন পড়ত এসব অস্ত্রের। কালক্রমে তাদের মধ্যে জীবনবোধ বাড়তে লাগল। তারা এগিয়ে যেতে লাগলো আরও উন্নতির পথে। এক পর্যায়ে তারা বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধভাবে গড়ে তুলে জনপদ। নির্মাণ করে ঘর ও তৈরী করে প্রয়োজনীয় আরো আনুষাঙ্গিক অনেক কিছু। একে একে তৈরী করতে লাগল বিভিন্ন ইমারত। পাহাড় কেটে তৈরী করতে লাগল বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি। তাদের এসব আবিষ্কার প্রকৃতির পরিবর্তন করেছিল। ফলে নেমে এসেছিল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ধ্বংস হয়েছিল অনেক কিছু। ঠিক সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ও চলছে বিভিন্ন আবিষ্কার। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে আরো ভয়াবহভাবে প্রাকৃতিক পরিবর্তন। আর ভয়াবহভাবে আমাদের ওপর ও নেমে আসছে প্রকৃতিক বিপর্যয়। প্রাচীন মানুষেরা অস্ত্র তৈরী করেছিল তাদের জীবন ধারণ ও জীবন রক্ষার্থে কিন্তু বর্তমানে আমরা কেন এতো মরণাস্ত্র তৈরী করছি? বর্তমান মানুষের মানবতা তো বেশী থাকার কথা কিন্তু কেন তারা এতো মানবতাহীন? তবে কেন আমরা সভ্যতার আস্ফালনে দাবি করে বলে উঠি হা-হতোস্মি?

শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১০

মানুষের ব্যক্তিত্বে সত্তার অস্তিত্ব

সিগমন্ড ফ্রয়েড মানুষের ব্যাক্তিত্বে ৩ টি সত্তার অস্তিত্ব কল্পনা করেছেন।


১.ব্যক্তির আদিসত্তা
২.একটি বাস্তবসত্তা
৩.নৈতিকসত্তা


১.আদিসত্তাঃ- আদিসত্তার প্রভাবে মানুষ সর্বদা সুখ ভোগ করতে চায়। সব রকম জৈবিক কামনা চরিতার্থ করতে চায়। এই সত্তার মূলনীতি হলো- সুখ পাওয়া আর দুঃখ এড়িয়ে চলা।


২.বাস্তবসত্তাঃ- ব্যক্তির বাস্তবসত্তার কাজ হলো আদি বা জৈবিক সত্তার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির সমন্বয় সাধন। আদিসত্তার বাসনাকে সে বাস্তবের নিরিখে বিচার করে দেখে এগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব কি অসম্ভব। আমাদের ঐচ্ছিক ক্রিয়া কলাপের উপর বাস্তবসত্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রন থাকে তাই এর চাহিদা প্রকাশমাত্র তা কার্যকর হয় না। যদি দেখে অনুকূলে আছে তাহলে কামনাগুলো প্রকাশ করে। আর যদি দেখে প্রতিকূলে তাহলে কামনাগুলো দাবিয়ে রাখে কিংবা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে। পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তবসত্তার এই বোধ আসে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।


৩.নৈতিকসত্তাঃ- জন্মের সময় মানুষের কোনো নীতি থাকে না। শিশু আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে এবং মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, ধর্মগুরু বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সংশ্রবের মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে ক্রমে ন্যায়-অন্যায় বোধ বা নীতিবোধ বিকশিত হয়। এই নীতিবোধের বিকাশ ব্যক্তিসত্তায় একটি নবতর সংযোজন। সাধারণত আমরা নৈতিকসত্তাকে বিবেকের আধার বলে মনে করতে পারি। জীবনে সব সময় নৈতিক সত্তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা হয় তা নয়; এর নির্দেশ মানতে বাস্তবসত্তা বাধ্য নয়। কখনো বাস্তবসত্তা জৈবিক সত্তার আবদার রক্ষা করে, কখনো নৈতিক সত্তার নির্দেশ মেনে চলে। আবার কখনো দু’য়ের মধ্যে আপোস রক্ষা করে চলে।

হবে কি অবসান?

ধনী-গরীবের দ্বন্ধ
হয়ে গিয়ে বন্ধ,
কখনো কি হবে
সমতার সৃষ্টি?
মিলেমিশে সবাই
ঝরাবে কি শান্তির বৃষ্টি?
সবার কি আসবে
এই ক্ষেত্রে দৃষ্টি?
আত্মাভিমান, আমর্ষণ
করবে কি সবাই উৎপাটন?
পৃথিবীর সব কালো
একসাথে করে আলো
নব দিনের আশায় চলে;
সব ব্যাথা-বেদনা ভুলে
খুলে দিয়ে মনের দ্বার
ভালোবেসে হবে কি একাকার?

কেন্দ্রবিন্দু হতে দূরে

আমরা মানবজীবনে যা কিছুই করি এর পেছনে কোনো না কোনো কেন্দ্রবিন্দু থাকে। এই কেন্দ্রবিন্দুকে কেন্দ্র করেই মানবজীবন আবর্তিত হয়। এই আবর্তনের জন্যই আমরা করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অনেক প্রত্যাশা। সোনালী স্বপ্নে বিভোর হয়েই মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছিল এদেশের আপামর জনতা। তারা এই প্রত্যাশা করেই নেমেছিল যে, আমরা না বাঁচলেও আমাদের প্রজন্ম একটি স্বাধীন,সার্বভৌম রাষ্ট্রে বাস করবে। তাদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে বটে কিন্তু অন্যান্য স্বপ্নগুলোও কি বাস্তবায়িত হয়েছে? তারা কি শুধু স্বাধীন,সার্বভৌম রাষ্ট্রই কামনা করেছিল? তা না করলে তাদের স্বপ্নগুলো কি ছিল? তাদের স্বপ্নগুলো কি ছিল কোনো যুদ্ধাপরাধী এদেশে সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়া? স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরও তাদের এই স্বাধীন,সার্বভৌম দেশে বিচার না হওয়া? শুধু একুশে ফেব্রুয়ারী, ২৬ই মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর এই দিনগুলোর মাঝেই কি স্বাধীনতার চেতনা বিদ্যমান? আর এই দিনগুলোর মাঝেই কি নিজেকে দেশপ্রেমিক বলে পরিচয় দেয়া তথা অগ্নিঝড়া বক্তৃতা আর সবাইকে ব্যঙ্গ করে সবার নাকে, মুখে, চোখে ধূলো দিয়ে রাষ্ট্রিয় সম্পদ হরণ করা? এই কি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এই কি আমাদের জাগ্রত বিবেকের নমুনা?


“হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা
করেছে হৃদয় হরণ
তাইতো তাদের স্বপ্নের কথা
হয়না আমাদের স্মরণ;
তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা
এখনো হয়নি হৃদয়ে গাঁথা।"

বিদ্রোহ ও মুক্তি

বিদ্রোহ কথাটা বলতেই আমরা বুঝি সংগ্রাম করা। আর এর পেছনে থাকা মুক্তি তথা স্বাধীনতা।স্বাধীনতার জন্যেই করতে হয় বিদ্রোহ। ত্যাগ করতে হয় অনেক কিছু। কিন্তু এই বিদ্রোহ কথাটা শুনলে আমাদের অনেকেরই দৃষ্টি চলে যায় ৭১-এ। কিন্তু আমরা গভীরভাবে ভাবিনা যে বিদ্রোহ কখনোই শেষ হয়না। বিদ্রোহের শুধু রূপ বদলায়। সামাজিক তথা রাষ্ট্রিয় মুক্তির জন্য সবাইকে বিদ্রোহ করতে হবে। কিন্তু এই বিদ্রোহ আমরা ক’জন করছি? প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকেই বিদ্রোহ করতে হবে। কেউ করবে আন্দোলনের মাধ্যমে, কেউ করবে লিখনির মাধ্যমে, কেউ করবে গানের মাধ্যমে। অর্থাৎ সকল স্তর থেকেই বিদ্রোহ করতে হবে মুক্তির জন্য। সকল স্তরের সমন্বিত বিদ্রোহই এনে দিতে পারে আমাদের সার্বিক মুক্তি। সকল স্তরেই বিদ্রোহ চালু এবং তা কার্যকরী হলেই আমরা ভোগ করতে পারব আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা। তাই আমাদের নিজেদের মুক্তির পথ নিজেদেরকেই অর্জন করতে হবে।

“ধ্বংসের মুখোমুখি মুখোমুখি আমরা
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল পদ্ম;
একে একে সব পথ হয়ে যাচ্ছে রূদ্ব
শুরূ করতে হবে তাই মুক্তির যুদ্ধ।”

সময়ের স্রোতে আমাদের নগ্ন যাত্রা

সময়ের স্রোতে আজ আমরা অধিকাংশই ভাসছি। কোথায় গিয়ে যে লাগব সে ব্যাপারে এখনো আমাদের কোনো ভাবনা নেই! আমরা কোথায় যাচ্ছি? আর কেন যাচ্ছি? এই ভাবনা আমাদের ক’জনের মাথায় ঘুরপাক খায়? বর্তমানে আমরা তরুণ সমাজ কোথায় আছি? আমরা পশ্চিমা ও অন্য সংষ্কৃতির করাল গ্রাসে কি আবর্তিত হইনি? যদি না ই হতাম বা হই তাহলে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া এগুলো আজ কোন পর্যায়ে থাকার কথা? আমাদের জতীয় খেলা কাবাডি তা আজ আমরা পুস্তকগুলোর মাঝেই দেখি। অপরদিকে আমদের পোশাক-পরিচ্ছদে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। তরূণ-তরূণীরা আজ পড়ছে হরেক রকমের কাপড় যা নগ্নতারই সাক্ষ্য বহন করছে। চুলে করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রং। অনেক মেয়েরা তাদের চুল কেটে ছোট করছে আর ছেলেরা এর বিপরীত। ছেলেরা কানে দুল দিচ্ছে এবং হাতেও দিচ্ছে এক ধরনের রিং। এসবে মধ্যে দিয়ে কি আমাদের ঐতিহ্য ফুটে উঠছে নাকি নগ্নতার চিহ্ন প্রবল হচ্ছে? এর থেকে উত্তরণের আমাদের কি কোনো পথ নেই? তবে কি সংষ্কৃতি শুধু পহেলা বৈশাখ আর বসন্তবরণের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? আমরা কি আমাদের অতীত সংষ্কৃতি নিয়ে সমৃদ্ধ ছিলাম না? আমদের সংষ্কৃতি এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যা পশ্চিমা ও অন্যান্য দেশের সংষ্কৃতি ছিল না। তবে কেন আমরা নিজ সংষ্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? অন্যের সংষ্কৃতি বাঙালি কেন ধারণ করবে? তবে কি সময়ের স্রোতে বাঙালি আর কখনো সংবিৎ ফিরে পাবে না?

ধিক্ এই সভ্যতাকে

সভ্যতার শুরু সেই প্রাচীন কাল থেকেই। সেই প্রাচীন বা আদিম সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার যে গুলো ছিল তার মধ্যে আগুন ছিল সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। এই আগুন দ্বারা আদিম মানুষেরা তাদের অনেক খাদ্যই পুড়িয়ে খেত। ফলে তৎকালীন সময়ে আগুন এই মানুষদের জীবনপট ব্যাপকভাবেই পরিবর্তন করেছিল। সেই সভ্যতার ধারা তাদের প্রজন্ম হিসেবে আমরাই অব্যাহত রেখছি। সময়ের বিবর্তনে আমরা পেয়েছি অনেক কিছু। এই সভ্যতার অত্যাধুনিক কালে আমরা অবস্থান করছি। প্রতিনিয়তই সৃষ্টি করছি কোনো না কোনো কিছু। কিন্তু তাই বলে যে সৃষ্টি করেই যাচ্ছি তা কিন্তু নয়! সৃষ্টির বিপরীতে যার অবস্থান তারও কিন্তু আমরা কম দাবিদার নই!


মূলত সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে। যার লক্ষ্যেই সভ্যতার এই ক্রমবিকাশ। আসলেই যদি সভ্যতা মানুষের জীবনমানকে কেন্দ্র করেই যদি আবর্তিত হয় বা হত তাহলে কি পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদের উদ্ভব হত? বর্তমানে এই তাই তুমুল গতিতে চলছে। যার ফলে দরিদ্র দেশগুলো অসহায় হয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আবার গরীব রাষ্ট্রগুলোতে চলছে বিভিন্ন এন.জি.ও -র সাহায্যের নামে-শোষণ। চালানো হচ্ছে শক্তিহীন ও দারিদ্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবেও নির্যাতন। বহু বছর যাবত ইসরায়েল-ফিলিস্থিনিদের ওপর চালাচ্ছে অমানবিক নির্যাতন ও হত্যাকান্ড। জাতিসংঘ এসব বন্ধে কতটুকু কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে?


আবার এই যুগে কারা বেশী সভ্যতার দাবিদার? তবে কি পশ্চিমা? প্রাচ্য? এশিয়া? তা না হলে কারা? তাদের কে কি সভ্য বলা যায় না?


বাসতব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিলে রবীন্দ্রনাথের " দুই বিঘা জমি " কবিতার একটি লাইনের কিছু অংশ বড় বেশী মনে পড়ে যায়-


" ধিক্ ধিক্ ওরে শতধিক্ তোরে "

আলোর পথে

পথ আমাদের ভেজা
তারপর আবার অনেক কাদা,
হাটলে পা পিছলে যায়
তবু পথ অতিক্রম করতে হবে
অতি সন্তর্পণে।
এগিয়ে যেতে হবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে
খুঁজে বের করতে হবে আলোর ফোয়ারা;
প্রজ্বলিত মশাল নিয়ে ফিরতে হবে।
এর আলো পৌঁছে দিতে হবে-
পৌঁছে দিতে হবে সকল দোর্ গোড়ায়।
উদ্ভাসিত করতে হবে সমাজ।
মাঝেমাঝে দমকা বাতাসে নিভে যাবে মশাল
এতে দমে গেলে চলবে না;
উপেক্ষা করে এই দমকা বাতাস
আবার জ্বালাতে হবে নিভে যাওয়া মশাল।
এগিয়ে যেতে হবে একসাথে
রক্তিম, দ্যুতিময় সূর্যের দিকে।

বিশ্ব ও বংলাদশে

“এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব, এগিয়ে যাচ্ছে জীবন”।জীবন এমন এক চলমান যান যার কোনো ক্ষান্ত নেই, বিশ্রাম নেই।প্রাণ প্রতিনিয়তই এগিয়ে চলছে সামনে সকল বাঁধা বিপত্তি ভেদ করে ভালো কিছুর প্রত্যাশায়। তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে দৃষ্টি দিলে তা কিন্তু এতটা নয়! ‘বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে আর যাচ্ছে জনতা’। আবার ধাবিত হচ্ছে এই বিশ্ব তথা জনগনই! বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলছে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দা। কিন্তু বাঙলাদেশে এর প্রভাব এখনো প্রকট আকার ধারণ করেনি। যদি পোশাক শিল্পের মধ্যে এর প্রভাব পড়ে তবে যে কি ঘটবে তা সহযেই অনুমেয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সকলেরই উচিত সঠিক পথ খুঁজে বরে করা।


সকল কিছু মোকাবিলা করার জন্য বাঙলার জনগণ একটি নির্বাচন করেছে। সকলেই ভেবেছিল যে একটু সস্তি পাবে। কিন্তু তা আর কোথায়? যেখানে যখন আলোচনার প্রয়োজন, সেখানে চলছে গোলমাল। এই অবস্থায় দেশ কতটুকু বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে?


আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে করা হয় সর্বোচ্চ বাজেট। আবার আমরা তাও জানি যে, এ খাতেই হয় সবচেয়ে বেশী দূর্নীতি। তাহলে সর্বোচ্চ বাজেটের লাভটা কি? সরকারি দল কোনো কোনো চুক্তি করলে বিরোধী দল তা মেনে নেয় না। পালন করে হরতাল ও অরও কতো কিছু। কিন্তু যদি সাংসদদের পে কোনো বিল পাস করা হয় তাহলে আর কোনো বিরোধী দল এ দেশে আছে কি না তা বুঝাই যায় না। এই হলো যখন অবস্থা, তাহলে দেশ কোথায় যাবে? কিভাবে মোকাবিলা করবে এই বৈশ্বিক পরিস্থিতি?


এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুকান্ত ভট্টাচার্যের “জাগবার দিন আজ” কবিতার কিছু লাইনকে আমাদের কাজে প্রতিফলিত করতে হবে-


“পণ করো দৈত্যের সঙ্গে
হানবো বজ্রাঘাত মিলবো সবাই একসঙ্গে
সংগ্রাম শুরু কর মক্তির
দিন নেই তর্ক ও যুক্তির
অজকে শপথ করো সকলে
বাঁচাবো আমার দেশ যাবে না তা শত্রুর দখলে।”

দৃষ্টি তুমি কোথায়?

ওই যে দেখছি সবুজ পাহাড়, অবারিত প্রান্তর, বিশাল আকাশ, সমুদ্রের গাঢ় নীল জলরাশি। কর্ণে ভেসে আসছে মাতাল পবনের শব্দ। আবার সব সৌন্দর্য্যময় প্রকৃতি আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে কুয়াশা। হয়ে যাচ্ছে সব দৃষ্টিগোচর।


দৃষ্টি দখে বৃষ্টি; দখে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা। আবার কোথায় যায় এ দৃষ্টি? কেন লুপ্ত হয়ে যায় এ দৃষ্টি? কিসের নেশায় অন্ধকারে ঢাকা পরে এ দৃষ্টি? “দৃষ্টি তুমি কোথায় থাক যে সব সময় তোমার দেখা মেলে না”? “দৃষ্টি তুমি কি ভয় পাও না স্বার্থের গন্ধে ঘুরে বেড়াও”?


“তুমি কি সর্বদাই থাক আচ্ছন্ন আর সুসময়ে কিংবা তোমার বেলায়ই হও বিস্তৃত”? হে দৃষ্টি, তোমার কি দৃষ্টিতে পড়ে না দুঃখী মানুষজন, অন্যায়, অত্যাচার, অগণতান্তিক কার্যকলাপ? অর যদি না ই পড়ে তবে এ সকলই কি তোমার ঊর্দ্ধে? তবে কি আমরা মনে করব তুমি চলে গেছ অস্তাচলে? নাকি তোমার দৃষ্টিতে জেগে উঠার সময় হয়নি আজও? আর সময় হলে তা কতদূর?

“আর কতো কতো অবিচার দেখলে তুমি দ্বিপ্তীমান সূর্যের মতো ভাসমান হবে”?

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১০

আজও আমি

আজও আমি সেই আগের মতই পড়ে আছি,
যেভাবে পড়ে রয়েছিলাম বর্ষায়;
ঠিক, ঠিক সেই রকমই আজও আমি!
নিঃসঙ্গতায় নিমগ্ন থাকি প্রায় সারাক্ষণই।
আর হারানো সুখময় স্মৃতিগুলি কেবল আমাকে
নির্জনে কুড়েকুড়ে খায়।
মাঝেমাঝে মনে হয় চলে যাই;
কিন্তু এ ও ভাবি আবার, যাব কোথায়?
শৈশব তো কতো আগেই চলে গেছে ......
এখন তো আমি ভারি হাতে ভরদিয়ে অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়েছি।
দাঁড়িয়েছি বাস্তবতার সীমানায়।
সব ব্যথা ভুলে
খুঁজে ফিরছি মুক্তি।
খুঁজে ফিরছি, খুঁজে ফিরছি মুক্তি
জীবনের অজানা সকল স্তরে ......।

কখন ভাববে

চারপাশে নেই কোনো
স্নিগ্ধ বাতাস,
আছে শুধু সর্বপাশে
যান্ত্রিকতার আভাস।
হনহনিয়ে ছুটছে সবাই
কর্মব্যস্ততা ঘিরে;
কান্ত-শ্রান্ত দেহ নিয়ে
ঘরে আবার ফিরে।
নিজ স্বার্থ করতে চরিতার্থ
অবলম্বন করে সব;
কেউ দেখলে কোন অন্যায়
একটু ও করেনা রব।
মানবতাহীনতায় ডুবে গেছি মোরা
তাইতো এত অন্ধকার,
চারপাশে বাজে তাই
অবিচারের ঝঙ্কার।
কোনো দিকেই নেই বেশী
ঊজ্জ্বলতার চ্ছটা,
কখন ভাববে সব মনুষে
ভালো হবার কথা?

ধন ও মন

মানবজীবনে অর্থ-সম্পদ তথা ধনের প্রয়োজন আছে।তা কোনো মানুষই বর্তমানে অস্বীকার করতে পারবে না।আমরা একটু দৃষ্টি দিলেই তা দেখি এবং দেখছি।একটি শিশু যখন তাঁর মায়ের পেটে বেড়ে উঠে তখন থেকেই তাঁর জন্য টাকা খরচ হতে থাকে।জন্মের পর থেকে সমাধি পর্যন্ত টাকার প্রয়োজন।তাই বলে অঢেল টাকার প্রয়োজন হয় না।


কিন্তু আমরা দেখতে পাই ধনী ব্যক্তিদের ব্যাংকে পাষাণ স্তুপের মতো টাকা জমা আছে।আর অন্যদিকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে হাজারো মানুষ।কিন্তু এত টাকা সত্বেও ক'জন এগিয়ে আসছে?হিসেব করলে দেখা যাবে তা নিতান্তই কম! কিন্তু এই দেশকে এগিয়ে নেবার জন্য তাদের কি কিছুই করার নেই?


টাকা থাকলেই কোনো উন্নয়নমূলক কাজে সাহায্য করা যায় না।এর জন্য প্রয়োজন একটা মনের।টাকা থাকলে বোকার রাজ্যে নিজেকে বড় জাহির করা যায় কিন্তু প্রকৃত সম্মন পাওয়া যায় না।বিবেক নামক সত্তার সামনে সব দর্প অহংকার চুরমার হয়ে যাবে।আমাদের এই দেশে ক'জন বিত্তশালী লোক লাইব্রেরী স্থাপন করেছে সর্বসাধারণের জ্ঞান চর্চার জন্যে?তবে তাঁরা কেন পারছে ন?এর প্রধান কারণ, তাদের মন আত্মকেন্দ্রিক।তাঁরা সর্বক্ষণই নিজ স্বার্থ উদ্ধারে নিমগ্ন থাকে।


"ধন ও মন" এই কথাটির দিকে দৃষ্টি দিলেই সেই ভাব-সম্প্রসারণের দু'টি লাইন মনে পড়ে যায়-


"প্রাণ থাকলে প্রণী হয় কিন্তু
মন না থাকলে মানুষ হয় না"

অভাব এই দেশে

বাংলাদেশের তৃণমূল উন্নয়নের জন্য যে শ্রেণীর বা উজ্জ্বল মানসিকতাময় লোকের অভাব; সেই শ্রেণীগুলো হলো-


১। শিক্ষিত লোক
২। সৃষ্টিশীল শিক্ষিত লোক
৩। উন্নত মানসিকতায় পূর্ণ লোক বা, নিঃস্বর্থ মানসিকতায় পূর্ণ লোক ও
৪। সৃষ্টিশীলতাকে আত্মকেন্দ্রিকহীন মানসিকতা নিয়ে সকল মতের সমন্বয় ঘটিয়ে তা কার্যে পরিণত করার লোক।


এই শ্রেণীর লোকগুলোর চরম অভাব বাংলাদেশে। তাই এ অবস্থা বাংলার দুঃখী, দরিদ্র, অসহায় মানুষদের।তাই এ অবস্থা থেকে উওরণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন উপরোল্লিখিত মানুষের যারা সবসময় ন্যায়-অন্যায় বিচার করবে বিবেক দ্বারা। আর শুধু দেশের জন্যই আত্মবিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকবে সর্বদা সকল অবস্থায়।

তখনো

তোমাকে দেখেছিলাম তখনো
আবার দেখছি এখনো,
সেই আগের মতই নির্বিকার;
নির্বিকার তোমার আচরণ।
আলো-আধাঁরের মাঝে
কতো রকম সাজে
যাচ্ছে চলে কতো ক্ষণ।
কেবল পরিবর্তনশীল
আমার মন; আর,
ক্ষণপ্রভাতূল্য জীবন।

প্রত্যাশার বিপরীতে

মানব মন প্রতি মুহূর্তই প্রত্যশা করে কোন না কোন কিছু। কিন্তু এই প্রত্যাশা অনুযায়ী পায় না অনেকই। ফলে জীবনে কিংবা সমাজেও পড়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর প্রভাব। দেখা দেয় পারিবারিক সমস্যা। ফলে জীবন তথা সমাজের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। এই পারিবারিক সমস্যা ক্রমান্বয়ে সামাজিক সমস্যায়ও মাঝেমাঝে পরিণত হয়। আর রাষ্ট্র সমাজের বাইরে নয়। যেহেতু, রাষ্ট্র সমাজের বাইরে নয় সেহেতু, এই সমস্যায় রাষ্ট্রের সকল মানুষ পতিত হতে পারে এবং তা হয়। এই প্রত্যাশার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমরা একটু দৃষ্টি দিলে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে দেখতে পাই। ফলে রষ্ট্রের সবাই এর ছোবলে বিদ্ব হয়। ডাকা হয় হরতাল, বর্জন করা হয় সংসদ অধিবেশন। এতে সাধারণ মানুষেরই ভোগান্তি বাড়ে। এসব যে কতো প্রকট তার আমরা সবাই ভোক্তভোগী। আবার প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগসূএ থাকলে বৈরীতা থাকে না। ফলে কমবেশী ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় উন্নয়ন সাধিত হয়। বলতে গেলে প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করেই যদি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন আবর্তিত হয় তবে সাধারণ মানুষের অমঙ্গল হবার সম্ভাবনাই থাকে বেশী।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড আবর্তিত হয় এই সূত্রে-


প্রত্যাশা = প্রাপ্তি = বৈরীতা


১ = ১/২ = -১/২
১ = ১ = ০
০ = ০ = ০